Back to Library
Subconscious Parasite - Read Free Science Fiction and Thriller Book Cover
0

Subconscious Parasite

By Nasif Muhammad

চরম ডিহাইড্রেশন আর এক অস্বাভাবিক তৃষ্ণায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় নাসিফের। এক গ্লাস পানির খোঁজে অন্ধকার কিচেনে যাওয়ার পর তার হাতে এসে পড়ে অদ্ভুত এক কালচে, ভারী এবং মেটালিক তরল। সার্ভাইভাল ইন্সটিংক্টের বশে সেই তরল পান করতেই ভেঙে পড়ে চারপাশের চেনা পৃথিবীর ফিজিক্স এবং রিয়েলিটি। নাসিফ ছিটকে পড়ে এক অজানা, নন-ইউক্লিডিয়ান ডাইমেনশনে, যেখানে গ্র্যাভিটি কাজ করে চোখের দৃষ্টিতে, আর মানুষের চিন্তাই রূপ নেয় প্রাণঘাতী অস্ত্রে। সেই অনন্ত শূন্যতায় সে একা নয়, ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কসমিক ইন্টেলিজেন্স ওত পেতে আছে মানুষের সবচেয়ে গভীর ট্রমা আর মেমোরি হ্যাক করার জন্য। নিজের মন এবং স্মৃতির সাথে এই সাইকোলজিক্যাল যুদ্ধে নাসিফ কি পারবে নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে চেনা পৃথিবীতে ফিরে আসতে? নাকি অপেক্ষা করছে অন্য কোনো ভয়ংকর সত্য? সাইকোলজি, কোয়ান্টাম ফিজিক্স এবং মহাজাগতিক রহস্যের এক রুদ্ধশ্বাস সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার—যা আপনার চারপাশের বাস্তবতা নিয়ে আপনাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।

Subconscious Parasiteসাবকনশাস প্যারাসাইটNasif Muhammadনাসিফ মুহাম্মাদBangla Science Fiction

Chapters

18

#পর্বঃ ১

গলার ভেতরে মরুভূমির তপ্ত বালি জমলে যেমন লাগে ঠিক তেমন একটা খসখসে অনুভূতি নিয়ে চোখ খুললাম।

শ্বাস নিতে মারাত্মক কষ্ট হচ্ছে। ফুসফুস ডেসপারেট হয়ে বাতাস টানছে কিন্তু গলার ভেতরের শুকিয়ে যাওয়া টিস্যুগুলো সেই বাতাসে বিন্দুমাত্র আর্দ্রতা পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কেউ একজন অত্যন্ত যত্ন নিয়ে জিরো সাইজের স্যান্ডপেপার দিয়ে আমার শ্বাসনালীর ভেতরটা ঘষে দিয়েছে।

আধুনিক যুগে আমরা তৃষ্ণা বলতে যা বুঝি সেটা কোনো আসল তৃষ্ণা নয়। আমাদের হাতে সবসময় একটা কফি মগ অথবা মেটালিক ওয়াটার বোতল থাকে। আমরা একটু গলা শুকালেই পানি খেয়ে নিই। আমরা ভুলে গেছি অ্যাবসলিউট ডিহাইড্রেশন কাকে বলে। যখন তোমার শরীরের কোষে কোষে পানির চরম ঘাটতি দেখা দেয়, তখন তোমার ব্রেইন তার সমস্ত কমপ্লেক্স চিন্তা চিরতরে ডিলিট করে দেয়। তোমার ক্যারিয়ার, তোমার রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস, তোমার পেমেন্ট, তোমার সোশ্যাল মিডিয়ার ফলোয়ার সংখ্যা, সব কিছু সম্পূর্ণ ইরেলেভেন্ট হয়ে যায়। তোমার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব, তোমার ইগো, তোমার আইডেন্টিটি সংকুচিত হয়ে কেবল একটা মলিকিউলের ওপর ফোকাস করে। এইচ টু ও। দুই অণু হাইড্রোজেন এবং এক অণু অক্সিজেন।

চোখ মেলার পর প্রথম যে জিনিসটা আমার ভিশন ফিল্ডে ধরা পড়ল সেটা হলো সাইড টেবিলের ওপর রাখা ডিজিটাল ঘড়ির লাল রঙের নাম্বার। ৩:০৩।

ঠিক এই সময়টাতে ঘুম ভাঙাটা পৃথিবীর সবচেয়ে অস্বস্তিকর এবং ভয়ঙ্কর অনুভূতির একটা।

তুমি কি জানো মানুষ কেন ঠিক রাত তিনটায় জেগে ওঠে? তুমি ভাবো এটা একটা র‍্যান্ডম বায়োলজিক্যাল ঘটনা। তুমি ধরে নিয়েছ তোমার ব্লাডার ফুল হয়ে গেছে অথবা তোমার অতিরিক্ত তৃষ্ণা পেয়েছে বলে তুমি জেগে উঠেছ। রাত দুইটা থেকে তিনটার মাঝখানে আমাদের বডির কোর টেম্পারেচার সবচেয়ে নিচে নেমে যায়। আমাদের ব্রেইনের মেলাটোনিন হরমোনের লেভেল একটা ক্রিটিক্যাল স্টেজে থাকে। ঠিক ওই স্পেসিফিক সময়টাতে আমাদের লিভার শরীরের সব টক্সিন ক্লিন করার জন্য ওভারটাইম কাজ শুরু করে। এই ডিটক্সিফিকেশন প্রসেসটার জন্য শরীরের প্রচুর এনার্জি দরকার হয়। আর সেই এনার্জির জোগান দিতে ব্রেইন হঠাৎ করে একটা হিউজ কর্টিসল স্পাইক তৈরি করে।

কর্টিসল হলো প্রাইমাল স্ট্রেস হরমোন। এই হরমোনটা তোমার নার্ভাস সিস্টেমকে সিগন্যাল দেয় যে আশপাশে কোনো প্রাণঘাতী বিপদ আছে।

এজন্যই রাত তিনটায় হঠাৎ ঘুম ভাঙলে তোমার ভেতরে একটা অদ্ভুত প্যানিক কাজ করে। তুমি জানো না কিসের ভয়। কিন্তু তোমার সাবকনশাস মাইন্ড তোমাকে অ্যালার্ট করে দেয় যে অন্ধকার থেকে কিছু একটা তোমাকে দেখছে। তোমার হার্টবিট সামান্য বেড়ে যায়। তুমি এক্সট্রিমলি একা ফিল করো। পৃথিবীর সব মানুষ যখন ডিপ স্লিপ সাইকেলে আছে তখন তুমি একা জেগে আছো। এই একাকিত্ব কোনো সাধারণ আধুনিক একাকিত্ব না। এই একাকিত্ব হলো এভোলিউশনারি সাইকোলজির একটা ডিরেক্ট বাইপ্রোডাক্ট।

হাজার হাজার বছর আগে যখন আমাদের পূর্বপুরুষরা গুহায় ঘুমাতো তখন রাতের এই সময়টাতে শিকারি প্রাণীদের অ্যাটাক করার চান্স সবচেয়ে বেশি থাকতো। আমাদের ডিএনএ এখনো সেই পুরোনো অ্যালগরিদম মেনে চলছে। তোমার বেডরুমের বাইরে কোনো স্যাবারট্যুথ টাইগার অথবা নেকড়ে নেই, কিন্তু তোমার ব্রেইনের অ্যামিগডালা এখনো সেই পুরোনো সারভাইভাল কোড রান করছে। সে কনস্ট্যান্টলি থ্রেট খুঁজছে।

আমি বিছানায় উঠে বসলাম।

চারপাশটা কেমন যেন অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। নিস্তব্ধতা শব্দটার আসল ডেফিনেশন আমরা অনেকেই জানি না। আমরা ভাবি কোনো সাউন্ড না থাকাই হলো নিস্তব্ধতা। কিন্তু আসল নিস্তব্ধতা হলো একটা ফিজিক্যাল বস্তু। এটা বাতাসের প্রেসার চেঞ্জ করে দেয়। তোমার কানের পর্দায় একটা অদ্ভুত প্রেশার তৈরি করে। আমার বেডরুমের এই মুহূর্তের নিস্তব্ধতাটা ঠিক সেরকম ভারী।

সাধারণত রাতের বেলাতেও শহরের একটা নিজস্ব ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ডট্র্যাক থাকে। দূর দিয়ে চলে যাওয়া কোনো ট্রাকের টায়ারের ঘর্ষণ। কোনো রাস্তার কুকুরের ডাক। এসির কম্প্রেসরের ভাইব্রেশন। কিন্তু আজ রাতে এসব কিছুই নেই। শূন্য। অ্যাবসলিউট ভ্যাকিউম।

যেন কেউ একজন মহাবিশ্বের মাস্টার কন্ট্রোল প্যানেল থেকে পুরো পৃথিবীর ভলিউম বাটনটা জিরো করে দিয়েছে।

মাইক্রোসফটের হেডকোয়ার্টারে একটা রুম আছে যাকে বলা হয় অ্যানেকোয়িক চেম্বার। পৃথিবীর সবচেয়ে শব্দহীন জায়গা। সেখানে গেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়, কারণ তারা নিজেদের রক্ত চলাচলের শব্দ এবং হার্টবিট শুনতে পায়। আমার এখন ঠিক সেই চেম্বারে বসে থাকার মতো অনুভূতি হচ্ছে। আমার কানের ভেতরে একটা হাই ফ্রিকোয়েন্সির রিংগিং সাউন্ড হচ্ছে। টিনিটাস। যখন বাইরের কোনো শব্দ থাকে না, তখন ব্রেইন নিজের মতো করে একটা ফ্যান্টম সাউন্ড তৈরি করে নেয়। ব্রেইন শূন্যতা সহ্য করতে পারে না।

আমার নার্ভাস সিস্টেম সম্ভবত আমাকে ট্রিক করছে। সিভিয়ার ডিহাইড্রেশন হলে ব্রেইনের ফ্রন্টাল লোব ঠিকমতো কাজ করে না। হ্যালুসিনেশন হওয়াটা তখন খুব স্বাভাবিক একটা ফিজিক্যাল রিয়্যাকশন।

আমি নিজেকে লজিক দিয়ে বোঝালাম আমার কেবল এক গ্লাস পানি দরকার। পানি খেলে ব্লাডের ভলিউম বাড়বে, ব্রেইনে অক্সিজেন সাপ্লাই ঠিক হবে এবং এই অদ্ভুত ডিসওরিয়েন্টেশন ফিলিংটা চলে যাবে।

আমি পায়ের ওপর থেকে ভারী কম্বলটা সরিয়ে দিলাম।

পা ফ্লোরে রাখলাম। টাইলসগুলো লিকুইড নাইট্রোজেনের মতো ঠান্ডা। থার্মোডাইনামিক্সের একটা বেসিক রুল হলো হিট সবসময় গরম অবজেক্ট থেকে ঠান্ডা অবজেক্টে ট্রান্সফার হয়। আমার পায়ের তলার বডি হিট টাইলসগুলো রাক্ষসের মতো শুষে নিচ্ছে। এই ফিজিক্যাল সেনসেশনটা আমাকে একটু রিয়েলিটিতে গ্রাউন্ডেড করল।

আমি ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোলাম।

আমার হাঁটার শব্দটা অসম্ভব অদ্ভুত শোনাচ্ছে। নিজের পায়ের শব্দ নিজের কাছে এত লাউড কখনো মনে হয়নি। মনে হচ্ছে আমি কোনো বিশাল খালি মসজিদের ভেতর একা হাঁটছি। সাউন্ড ওয়েভগুলো দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ইকো হয়ে আবার আমার কানে ফিরে আসছে।

দরজার মেটালিক নব ধরে ঘোরাতেই একটা শার্প ক্লিক শব্দ হলো।

করিডোরটা পুরোপুরি ব্ল্যাকআউট।

মানুষের চোখ সম্পূর্ণ অন্ধকারের সাথে মানিয়ে নিতে প্রায় তিরিশ মিনিট সময় নেয়। আমাদের চোখের রেটিনায় রড সেল বলে একটা ফটোরিসেপ্টর আছে যা লো লাইট কন্ডিশনে দেখতে সাহায্য করে। কিন্তু এই রড সেলগুলো ফুললি অ্যাক্টিভ হতে সময় লাগে। এই মুহূর্তে আমার চোখ অন্ধকারের ভেতরে কেবল কিছু রেন্ডম গ্রে পিক্সেল এবং স্ট্যাটিক নয়েজ দেখতে পাচ্ছে। অনেকটা পুরনো নষ্ট টেলিভিশনের স্ক্রিনের মতো।

তুমি কি কখনো ডিপলি ভেবে দেখেছ অন্ধকারে আমাদের ব্রেইন কীভাবে কাজ করে? ব্রেইন হলো ইউনিভার্সের সবচেয়ে পাওয়ারফুল প্যাটার্ন রিকগনিশন মেশিন। সে যখন চোখ থেকে পর্যাপ্ত ভিজ্যুয়াল ইনফরমেশন পায় না, তখন সে প্যানিক করে। সে নিজের ডেটাবেস থেকে রেন্ডম ইনফরমেশন জেনারেট করে গ্যাপগুলো ফিল করার চেষ্টা করে।

করিডোরের ওই ডানদিকের কোণায় পড়ে থাকা লন্ড্রি ব্যাগের শ্যাডোটাকে মনে হচ্ছে একটা মানুষের মাথা। ওই পাশের ডাইনিং চেয়ারটাকে মনে হচ্ছে একটা অদ্ভুত লম্বাটে প্রাণী। সাইকোলজির ভাষায় এটাকে বলে প্যারিডোলিয়া। মানুষের ব্রেইন রেন্ডম জিনিসের ভেতর মানুষের মুখ খোঁজার জন্য হার্ডওয়্যারড। আমি লজিক্যালি জানি এগুলো স্রেফ অপটিক্যাল ইল্যুশন। কিন্তু কনশাসলি জানার পরেও আমার অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম রিঅ্যাক্ট করছে। আমার লোম খাড়া হয়ে গেছে। ঘাড়ের পেছনের মাসলগুলো টাইট হয়ে আছে।

আমি দেয়াল ধরে ধরে অন্ধের মতো কিচেনের দিকে এগোতে লাগলাম।

প্রতিটা কদম ফেলার সাথে সাথে আমার মনে হচ্ছে আমি একটা অন্য ডাইমেনশনে শিফট হচ্ছি। বাতাসের ডেনসিটি মনে হচ্ছে এক্সপোনেনশিয়ালি বেড়ে গেছে। পানির নিচে হাঁটলে যেমন একটা ফিজিক্যাল রেজিস্ট্যান্স ফিল হয়, ঠিক তেমন একটা ইনভিজিবল বাধা আমি প্রতিটা স্টেপে ফিল করছি।

আমি কি স্বপ্ন দেখছি? ল্যুসিড ড্রিমিং চেক করার একটা খুব ফেমাস টেকনিক আছে। নিজের হাতের দিকে তাকানো অথবা ঘড়ি চেক করা। স্বপ্নে তুমি কখনো ডিজিটাল ঘড়ির টাইম ঠিকমতো পড়তে পারবে না। ব্রেইনের যে অংশটা লজিক এবং টেক্সট প্রসেস করে, সেটা ঘুমের মধ্যে শাটডাউন থাকে। ফলে নাম্বারগুলো সবসময় গ্লিচ করতে থাকে।

আমি আমার ডান হাতের স্মার্টওয়াচটার দিকে তাকালাম। স্ক্রিনটা ব্ল্যাঙ্ক। ডেড। জিরো পার্সেন্ট চার্জ।

অসম্ভব। ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর ছিলাম ঘড়িতে বাহান্ন পার্সেন্ট চার্জ ছিল। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি কোনো লজিক্যাল কারণ ছাড়া দুই ঘণ্টার ভেতরে এভাবে ড্রেন হতে পারে না। ব্যাটারির কেমিক্যাল রিয়্যাকশন স্পেস এবং টাইমের রুলস মেনে চলে।

আমার ব্রেইনে একটা রেড অ্যালার্ট বেজে উঠল। কিছু একটা মারাত্মক অফ।

রিয়েলিটি জিনিসটা আসলে কী? রিয়েলিটি হলো তোমার ফাইভ সেন্সেস থেকে আসা কিছু ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল যা তোমার ব্রেইন ডিকোড করে একটা থ্রিডি ওয়ার্ল্ড বানায়। তুমি আসলে পৃথিবীটাকে দেখো না, তুমি তোমার ব্রেইনের ভেতরে প্রজেক্ট করা একটা মুভি দেখো। যদি কোনো কারণে সেই ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যালগুলো ম্যানিপুলেট করা হয়, তাহলে তোমার পুরো রিয়েলিটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

কিন্তু এই মুহূর্তে এই কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে চিন্তা করার মতো বায়োলজিক্যাল এনার্জি আমার বডিতে নেই। আমার সেলুলার স্ট্রাকচার পানির জন্য আক্ষরিক অর্থে চিৎকার করছে। আমার ব্লাড প্রেশার ডেঞ্জারাস লেভেলে ফল করছে। আমাকে এনিহাউ কিচেনে পৌঁছাতেই হবে।

কিচেনের দরজাটা অর্ধেক খোলা।

ভেতরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের একটা খুব চিকন এবং দুর্বল আলোর রেখা এসে পড়েছে। সেই আলোতে কিচেনের মার্বেল কাউন্টারটা কোনোমতে দেখা যাচ্ছে।

আমি সিঙ্কের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।

পানির ফিল্টারের ট্যাপটা ধরলাম। স্টিলের ট্যাপটা অস্বাভাবিক রকমের ঠান্ডা। মনে হচ্ছে এটা লিকুইড হিলিয়ামের ভেতর ডুবিয়ে রাখা ছিল। আমার আঙুলের ডগার নার্ভ এন্ডিংগুলো ব্যথায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো।

আমি শেলফ থেকে একটা কাঁচের গ্লাস নিলাম।

ট্যাপটা ঘোরালাম।

পানির কোনো শব্দ নেই।

আমি অপেক্ষা করলাম। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড। সময় যেন এখানে রাবারের মতো স্ট্রেচ হয়ে গেছে। আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি বলছে গ্র্যাভিটি যত স্ট্রং হয় সময় তত স্লো হয়ে যায়। আমার মনে হচ্ছে আমি কোনো ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছি।

তারপর খুব ধীরগতিতে একটা মোটা ড্রপ গ্লাসের ভেতরে পড়ল।

টপ।

শব্দটা নরমাল পানির মতো না। শব্দটা এক্সট্রিমলি ভারী। অনেকটা পারদ অথবা গলে যাওয়া সীসার মতো কোনো ভারী মেটালিক লিকুইড ড্রপ করলে যেমন ডার্ক শব্দ হয় ঠিক তেমন।

আমি গ্লাসটা চোখের সামনে তুলে ধরলাম। ল্যাম্পপোস্টের ওই দুর্বল আলোতে পানিটাকে ট্রান্সপারেন্ট মনে হচ্ছে না। এটাকে কেমন যেন কালচে এবং ঘন মনে হচ্ছে।

আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। আমার সার্ভাইভাল ইন্সটিংক্ট কমান্ড দিচ্ছে এটা এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নিতে। কিন্তু আমার লজিক্যাল ব্রেইন বলছে এখানে কিছু একটা ফান্ডামেন্টাল ভুল আছে। ফিজিক্সের নিয়ম এখানে কাজ করছে না।

আমরা ভাবি আমরা কন্ট্রোলে আছি। আমরা ভাবি আমাদের ওয়াইফাই রাউটার, আমাদের ব্যাংক ব্যালেন্স, আমাদের অ্যালার্ম ক্লক আমাদেরকে একটা সেফটি নেট দিয়ে রেখেছে। আমরা নেচার থেকে নিজেদেরকে সম্পূর্ণ ডিসকানেক্ট করে ফেলেছি। আমরা এমন একটা ফলস রিয়েলিটিতে বাস করি যেখানে আমাদের সবচেয়ে বড় টেনশন হলো ইনস্টাগ্রামে কেউ আমার স্টোরি সিন করল কি না। আমরা ডোপামিনের স্লেভ হয়ে গেছি। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্ক্রলিং, তারপর কাজে যাওয়া, তারপর আবার স্ক্রলিং। আমাদের ব্রেইনের রিওয়ার্ড সিস্টেম হ্যাক হয়ে গেছে। সিলিকন ভ্যালির কিছু অ্যালগরিদম আমাদের ইমোশন কন্ট্রোল করছে।

কিন্তু নেচার খুব নিষ্ঠুর। নেচার যখন তার আসল রূপ দেখায় তখন এই সমস্ত ফেইক আইডেন্টিটি ক্র্যাশ করে। ঠিক এই মুহূর্তে, এই অন্ধকার কিচেনে দাঁড়িয়ে, হাতে এক গ্লাস অজানা ভারী লিকুইড নিয়ে আমি বুঝতে পারছি আমার পুরো এক্সিস্টেন্স কতটা অর্থহীন।

আমার সারা জীবনের অর্জিত জ্ঞান, আমার ডিগ্রি, আমার লজিক সবকিছু এখন ফেইল করছে।

আমি গ্লাসের সারফেস টেনশনটা খেয়াল করলাম। সাধারণ পানির সারফেস টেনশন এত হাই হয় না। গ্লাসের ভেতরে এই কালচে তরলটা যেন নিজের ভেতরে গুটিয়ে থাকতে চাইছে। পানির অণুগুলো একে অপরকে আকর্ষণ করে। কিন্তু এই তরলটার কোহেশন ফোর্স এত বেশি যে মনে হচ্ছে এটা কোনো সলিড অবজেক্টের মতো বিহেভ করছে।

আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করার কথা ভাবলাম। গ্লাসটা একটু কাত করে দেখলাম তরলটা কীভাবে মুভ করে। এটা সাধারণ পানির মতো ছলাৎ করে উঠল না। এটা একটা অদ্ভুত জেলির মতো স্লো মোশনে গ্লাসের দেয়াল বেয়ে নামল। গ্লাসের গায়ে কোনো দাগ অথবা আর্দ্রতা রেখে গেল না।

আমার ব্রেইনের ডেঞ্জার সিগন্যাল এখন অ্যালার্মিং রেটে বাজছে। এটা পানি নয়। আমি কনফার্ম এটা এই পৃথিবীর কোনো ন্যাচারাল এলিমেন্ট নয়।

কিন্তু তৃষ্ণা। তৃষ্ণা জিনিসটা লজিক বোঝে না।

মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে একটা ছোট্ট অংশ আছে যাকে থার্স্ট সেন্টার বলে। যখন ব্লাডে সোডিয়ামের কনসেন্ট্রেশন বেড়ে যায়, তখন এই থার্স্ট সেন্টার অ্যাক্টিভেট হয়। সে তখন তোমার কনশাস মাইন্ডকে বাইপাস করে বডির ডিরেক্ট কন্ট্রোল নিয়ে নেয়। তুমি তখন আর মানুষ থাকো না, তুমি একটা বায়োলজিক্যাল রোবটে পরিণত হও যার একটাই মিশন: হাইড্রেটেড হওয়া।

আমার হাত কাঁপছে।

অন্ধকারে আমার নিজের নিশ্বাস ফেলার শব্দটা সাইক্লোনের মতো শোনাচ্ছে।

আমি গ্লাসটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি।

মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তার কিউরিওসিটি। প্যান্ডোরা জানতো বক্সটা খোলা নিষেধ। সে জানতো এর ভেতরে পৃথিবীর সব অভিশাপ আটকে রাখা আছে। কিন্তু সে নিজেকে আটকাতে পারেনি। ওই অজানাকে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা মানুষের ডিএনএ-তে গাঁথা।

আমিও জানি এই গ্লাসের তরলটা পান করা মানে কোনো একটা অজানা এবং ভয়ানক রুলসকে অ্যাক্সেপ্ট করে নেওয়া। আমি জানি এটা পান করলে আমি আর আগের সেই মানুষটা থাকব না। আমার চেনা এই থ্রি ডাইমেনশনাল রিয়েলিটির সাথে আমার চুক্তি এইখানেই শেষ হয়ে যাবে।

আমার সাবকনশাস মাইন্ড অলরেডি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

আমি গ্লাসের রিমটা আমার নিচের ঠোঁটে ঠেকালাম।

তরলটার কোনো টেম্পারেচার নেই। এটা গরম না, ঠান্ডাও না। এটা অ্যাবসলিউট নিউট্রাল। মানবদেহ এমন কোনো বস্তু ফিল করতে পারে না যার কোনো রিলেটিভ টেম্পারেচার নেই। আমার মনে হলো আমার ঠোঁটটা একটা ভয়েডের সংস্পর্শে এসেছে। একটা শূন্যতা।

আমার চোখ বন্ধ হয়ে এল।

আমি গ্লাসটা কাত করলাম।

প্রথম ফোঁটাটা আমার জিবের ওপর পড়ল।

#পর্বঃ ২

প্রথম ফোঁটাটা আমার জিবের ওপর পড়ল। এক ফোঁটা তরল। একটা মাইক্রোস্কোপিক ইভেন্ট। মহাবিশ্বের বিশাল টাইমলাইনে এই এক ফোঁটা তরলের পতন সম্পূর্ণ অর্থহীন একটা ঘটনা। কিন্তু আমার শরীরের ভেতরে এই এক ফোঁটা তরল একটা নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোশনের মতো রিঅ্যাক্ট করল। স্বাদ জিনিসটা আসলে কীভাবে কাজ করে? আমরা প্রতিদিন কত কিছু খাই। ফাস্টফুড, বিরিয়ানি, কফি, কেক। আমাদের ব্রেইন এই স্বাদগুলোকে কীভাবে প্রসেস করে সেই মেকানিজমটা জানলে তুমি চমকে যাবে। তোমার জিবের ওপর হাজার হাজার ছোট ছোট বাম্প আছে। এগুলোকে এনাটমির ভাষায় প্যাপিলা বলে। এই প্যাপিলার ভেতরে থাকে টেস্ট বাড। এই টেস্ট বাডগুলো হলো এক একটা হাইলি সেনসিটিভ কেমিক্যাল সেন্সর। যখন তুমি কোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণ করো, সেই খাবারের কেমিক্যাল মলিকিউলগুলো তোমার মুখের স্যালাইভার সাথে মিশে যায়। তারপর সেই মলিকিউলগুলো তোমার টেস্ট বাডের রিসেপ্টরগুলোতে গিয়ে আনলক হয়। অনেকটা তালার ভেতরে নিখুঁত শেপের চাবি ঘোরানোর মতো। চাবি ঘুরলেই একটা ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল তৈরি হয়। সেই ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল তোমার ফেশিয়াল এবং গ্লোসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্রেনিয়াল নার্ভ বেয়ে সোজা ব্রেইনের গাসটেটরি কর্টেক্সে গিয়ে হিট করে। তখন তোমার ব্রেইন তোমাকে বলে তুমি মিষ্টি খাচ্ছ, টক খাচ্ছ, কিম্বা তিতা খাচ্ছ।

তোমার খাবারের নিজস্ব কোনো স্বাদ নেই। স্বাদ তৈরি হয় সম্পূর্ণ তোমার ব্রেইনের ভেতরে।

আমাদের ব্রেইন মূলত একটা পাওয়ারফুল প্রেডিকশন মেশিন। তুমি যখন এক গ্লাস পানির দিকে তাকাও, তখন তোমার ব্রেইন সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ক্যালকুলেট করে ফেলে এই পানির স্বাদ কেমন হবে। তোমার মেমোরি ব্যাংকে সারা জীবনের পান করা পানির হাজার হাজার ডেটা সেভ করা আছে। তুমি লজিক্যালি জানো বিশুদ্ধ পানির কোনো স্ট্রং টেস্ট নেই। তুমি জানো পানির একটা নির্দিষ্ট টেম্পারেচার এবং ডেনসিটি আছে। তোমার ব্রেইন তোমার গলার মাসলগুলোকে সেই স্পেসিফিক ডেটা অনুযায়ী প্রিপেয়ার করে রাখে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় ঠিক তখন, যখন তোমার ব্রেইনের এই প্রেডিকশন রিয়েলিটির সাথে বিন্দুমাত্র ম্যাচ করে না। তুমি যদি চোখ বন্ধ করে এক গ্লাস অরেঞ্জ জুস খাওয়ার মেন্টাল প্রিপারেশন নাও এবং কেউ যদি ওই অবস্থায় তোমাকে এক গ্লাস দুধ খাইয়ে দেয়, তোমার ব্রেইন কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরোপুরি শর্টসার্কিট করবে। তোমার রিফ্লেক্স অ্যাকশনে বমি চলে আসবে। দুধ কোনো ক্ষতিকর জিনিস নয়। কিন্তু তোমার ব্রেইন দুধ এক্সপেক্ট করছিল না। ওই সাডেন মিসম্যাচটা তোমার নার্ভাস সিস্টেমকে একটা এক্সট্রিম প্যানিক স্টেটে ফেলে দেয়।

ঠিক এই মুহূর্তে আমার ব্রেইনের ভেতরে একটা বিশাল মাত্রার সাইবার অ্যাটাক চলছে। আমার হাইপোথ্যালামাস এক্সপেক্ট করছিল এক গ্লাস সাধারণ এইচ টু ও। দুই অণু হাইড্রোজেন এবং এক অণু অক্সিজেনের একটা পরিচিত লাইফ সেভিং কম্বিনেশন। কিন্তু জিবের ওপর যে তরলটা পড়েছে সেটা পৃথিবীর ফিজিক্স এবং কেমিস্ট্রির কোনো নিয়ম মানছে না।

তরলটার স্বাদ অসম্ভব মেটালিক। তুমি কি কখনো পুরোনো মরচে ধরা লোহার কয়েন জিব দিয়ে চেটে দেখেছ? মুখ কেটে গেলে নিজের রক্তের স্বাদ পেয়েছ কখনো? রক্তে প্রচুর আয়রন থাকে বলে রক্তের স্বাদ মেটালিক হয়। কিন্তু এই অদ্ভুত তরলটার মেটালিক স্বাদ কোনো সাধারণ লোহার মতো নয়। এটা এত তীব্র, এত র, এত আনফিল্টারড যে আমার জিবের নার্ভ এন্ডিংগুলো সিভিয়ার ব্যথায় কুঁচকে গেল। মনে হচ্ছে আমি কোনো লিকুইড ব্যাটারি খাচ্ছি। লিথিয়াম, কপার এবং আরও কিছু অজানা হেভি মেটালের একটা ডেডলি কেমিক্যাল মিক্সচার। প্রকৃতিতে যেসব জিনিসের স্বাদ মেটালিক, সেগুলো সাধারণত আমাদের বায়োলজিক্যাল সিস্টেমের জন্য প্রাণঘাতী হয়। আমাদের ব্রেইন হার্ডওয়্যারড হয়ে আছে এই ধরনের সিগন্যাল পাওয়া মাত্রই বস্তুটাকে রিজেক্ট করার জন্য। আমার ব্রেইনের অ্যামিগডালা এখন পাগলের মতো রেড অ্যালার্ম বাজাচ্ছে। সে আমার গলার মাসলগুলোকে ডিরেক্ট কমান্ড দিচ্ছে বমি করে এই তরলটা ইমিডিয়েটলি বের করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমার বডি এখন আর আমার কন্ট্রোলে নেই। আমি পুরোপুরি প্যারালাইজড হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

এর পরের ভয়ংকর সেনসেশনটা হলো টেম্পারেচার। ঠান্ডা। তুমি ভাবছ ফ্রিজের বরফের মতো ঠান্ডা। তুমি ভাবছ এসি রুমের মতো ঠান্ডা। তুমি সম্পূর্ণ ভুল ভাবছ। আমরা পৃথিবীতে দৈনন্দিন জীবনে যেসব ঠান্ডার সাথে পরিচিত সেগুলো সবই রিলেটিভ কনসেপ্ট। জিরো ডিগ্রি সেলসিয়াসে পানি জমে বরফ হয়। কিন্তু মহাবিশ্বের আসল কনসেপ্ট অফ কোল্ডনেস হলো অ্যাবসলিউট জিরো। মাইনাস দুইশো তেহাত্তর ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই এক্সট্রিম টেম্পারেচারে পরমাণুর কাইনেটিক মুভমেন্ট চিরতরে থেমে যায়। ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চারদিকে তাদের অরবিটে ঘোরা বন্ধ করে দেয়। ম্যাটার তার ফিজিক্যাল এক্সিস্টেন্স হারিয়ে একটা কোয়ান্টাম স্টেটে চলে যায়। আমার জিবের ওপর পড়া তরলটার টেম্পারেচার ঠিক সেরকম একটা ইমপসিবল লেভেলে বিলং করে। এটা কোনো ফিজিক্যাল ঠান্ডা নয়। এটা হলো তাপের সম্পূর্ণ এবং অ্যাবসলিউট অনুপস্থিতি। যখন এই তরলটা আমার টিস্যুর সাথে টাচ করল, সে আমার শরীরের ওই নির্দিষ্ট জায়গার সমস্ত হিট এনার্জি ব্ল্যাকহোলের মতো শুষে নিল। আমার জিবের ওই অংশটা ইনস্ট্যান্টলি ফ্রস্টবাইট হওয়ার কথা। সেলুলার লেভেলে টিস্যু ড্যামেজ হয়ে গ্যাংগ্রিন হওয়ার কথা। কিন্তু সবচেয়ে বিভৎস ব্যাপার হলো আমার কোনো ফিজিক্যাল ড্যামেজ হচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে তরলটা আমার সেলের ডিএনএ স্ট্রাকচারের সাথে মার্জ হয়ে যাচ্ছে। সে আমার হিউম্যান বায়োলজিকে রিয়েল টাইমে রিরাইট করছে।

আধুনিক মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের বায়োলজিক্যাল অরিজিন থেকে কতটা ডিসকানেক্টেড সেটা তুমি শান্ত মাথায় চিন্তাও করতে পারবে না। আমরা সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রসেসড সুগার দিয়ে বানানো আর্টিফিশিয়াল সিরিয়াল খাই। দুপুরে কেমিক্যাল প্রিজারভেটিভ দেওয়া ফাস্টফুড গিলি। রাতে আর্টিফিশিয়াল ফ্লেভার দেওয়া কমার্শিয়াল এনার্জি ড্রিংকস খেয়ে নিজেদের রিচার্জ করার ফেইক চেষ্টা করি। আমাদের টেস্ট বাডগুলো ড্যামেজ হয়ে পুরোপুরি নাম্ব হয়ে গেছে। আমরা রিয়েল এবং ন্যাচারাল খাবারের স্বাদ চিরতরে ভুলে গেছি। আমরা এমন এক অভিশপ্ত জেনারেশন যারা আক্ষরিক অর্থে প্লাস্টিকের মোড়কে মোড়ানো একটা সিন্থেটিক জীবন যাপন করি। আমাদের ইমোশনগুলোও এখন প্লাস্টিক হয়ে গেছে। আমরা কাঁদি স্ক্রিনের ইমোজি দিয়ে। আমরা হাসি এল ও এল টাইপ করে। আমরা সত্যিকারের ফিজিক্যাল ব্যথা ফিল করি না। আমরা সত্যিকারের ডেডলি তৃষ্ণা ফিল করি না। আমাদের পুরো এক্সিস্টেন্স একটা ওয়েল ডিজাইন্ড সিন্থেটিক সিমুলেশন। কিন্তু এই অন্ধকার নিস্তব্ধ কিচেনে দাঁড়িয়ে, হাতে এই অসম্ভব মেটালিক তরলের গ্লাস নিয়ে আমি আমার জীবনের প্রথমবারের মতো রিয়েল কিছু ফিল করছি। এই তরলটা আমার ব্রেইনের ওপর জমে থাকা সমস্ত সিন্থেটিক সোশ্যাল লেয়ারগুলোকে এসিডের মতো গলিয়ে দিচ্ছে। সে আমাকে ফোর্স করছে আমার প্রাইমাল এক্সিস্টেন্সের মুখোমুখি হওয়ার জন্য। আমার ভেতরের আদিম সার্ভাইভাল ইন্সটিংক্ট জেগে উঠছে।

আমার জিবের ওপর থেকে তরলটা খুব স্লো মোশনে গলার দিকে এগোতে শুরু করল। আমি গিলতে চাইনি। আমার কনশাস মাইন্ড চিৎকার করে কমান্ড দিচ্ছিল গ্লাসটা ছুড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু গলার ভেতরের মেকানিজম অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেমের আন্ডারে কাজ করে। যখন কোনো লিকুইড গলার পেছনের ফ্যারিংস অংশে পৌঁছায়, তখন সোয়ালোয়িং রিফ্লেক্স অটোমেটিক্যালি ট্রিগার হয়। এটা একটা ইনভলান্টারি মাসল অ্যাকশন। তুমি চাইলেও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে এটা থামাতে পারবে না। তরলটা আমার ইসোফেগাস বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল। আমি আমার নার্ভাস সিস্টেমের প্রতিটা মিলিমিটারে তার মুভমেন্ট স্পষ্ট ফিল করতে পারছি। মনে হচ্ছে একটা লিকুইড নাইট্রোজেনের তৈরি সাপ আমার গলার ভেতর দিয়ে পাক খেয়ে নিচে নামছে। সে যেখানে যেখানে টাচ করছে, সেখানে একটা আনক্যানি নাম্বনেস তৈরি হচ্ছে। কোনো ফিজিক্যাল ব্যথা নেই। কেবল একটা ইনফিনিট শূন্যতা। আমার মনে হচ্ছে আমার ভেতরের ভাইটাল অর্গানগুলো একে একে পাওয়ার অফ হয়ে যাচ্ছে।

স্টমাকে পৌঁছানোর পর তরলটা তার আসল রূপ দেখানো শুরু করল। মানুষের পাকস্থলীতে হাইলি কনসেন্ট্রেটেড হাইড্রোক্লোরিক এসিড থাকে। এই গ্যাস্ট্রিক এসিডের পিএইচ লেভেল এত হাই যে এটা একটা মেটাল রেজার ব্লেড পর্যন্ত অনায়াসে গলিয়ে ফেলতে পারে। যেকোনো স্বাভাবিক খাবার স্টমাকে যাওয়ার পর এই পাওয়ারফুল এসিডের সাথে রিয়্যাক্ট করে ব্রেকডাউন হতে শুরু করে। কিন্তু এই মেটালিক তরলটা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার একটা আচরণ করছে। সে এসিডের সাথে সামান্যতম মিশছে না। সে স্টমাকের বায়োলজিক্যাল দেয়াল ভেদ করে অসমোসিস প্রক্রিয়ায় সরাসরি আমার ব্লাডস্ট্রিমে প্রবেশ করছে। আমি ফিজিক্যালি অনুভব করতে পারছি আমার শিরা উপশিরাগুলো দিয়ে একটা কনকনে ঠান্ডা নীল বিদ্যুতের স্রোত বইছে। আমার হার্টবিট সাডেনলি একটা ডেঞ্জারাস লেভেলে ড্রপ করল। পঁচাত্তর বিট পার মিনিট থেকে ডিরেক্ট চল্লিশ। তারপর ত্রিশ। তারপর পনেরো। আমার ব্রেইনে অক্সিজেন সাপ্লাই ড্রাস্টিক্যালি কমে আসছে। আমার চোখের ভিশন ফিল্ডের চারপাশটা ধীরে ধীরে কালো হয়ে আসছে। টানেল ভিশন। ক্লিনিক্যাল ডেথের ঠিক আগের মুহূর্তে মানুষের ঠিক এই এক্সপেরিয়েন্সটা হয়। ব্রেইন যখন সেন্স করতে পারে তার কাছে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সাপ্লাই নেই, তখন সে পেরিফেরাল অর্গানগুলো থেকে পাওয়ার কাট করে কেবল মেইন সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে ফোকাস করে নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করে।

আমি কি মারা যাচ্ছি? মৃত্যু জিনিসটা আসলে কেমন? আমরা সারাজীবন এই একটা অনিবার্য ফ্যাক্টকে ভয় পেয়ে কাটিয়ে দিই। আমরা লাইফ ইনস্যুরেন্স পলিসি কিনি। আমরা রুটিন হেলথ চেকআপ করাই। আমরা গাড়িতে বসে সেফটি বেল্ট বাঁধি। আমরা একটু বেশি বাঁচার জন্য ডেসপারেট হয়ে থাকি। কিন্তু আমরা কেউ বাঁচার আসল ফিলোসফি জানি না। আমরা কেবল পৃথিবীতে এক্সিস্ট করি। আমরা সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কর্পোরেট স্লেভ হিসেবে যান্ত্রিক কাজ করি। তারপর জ্যাম ঠেলে বাসায় ফিরে রিলস দেখে নিজেদের টায়ার্ড ব্রেইনকে নাম্ব করে রাখি। আমরা আমাদের বর্তমান জীবন নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্তুষ্ট নই। আমরা সবসময় সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখা অন্য কারো ফেক জীবন চাই। ইনস্টাগ্রামের ওই ট্রাভেল ইনফ্লুয়েন্সারের মতো কালারফুল জীবন। ওই ইয়াং বিলিয়নিয়ারের মতো স্ট্যাটাস। আমরা একটা অদৃশ্য সোশ্যাল ম্যাট্রিক্সে আটকা পড়ে আছি। এই মেটালিক তরলটা আমাকে সেই ম্যাট্রিক্স থেকে ফোর্সফুলি আনপ্লাগ করছে। সে আমার ব্রেইনের নিউরোট্রান্সমিটার ব্যালেন্স সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। ডোপামিন, সেরোটোনিন, এন্ডোরফিন সবগুলোর লেভেল এখন জিরোতে নেমে গেছে। আমার মনে হচ্ছে আমার মাথার খুলিটা ওপেন করে কেউ একজন আমার সফট ব্রেইনকে সরাসরি ডিপ স্পেসের ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এনেছে। আমার লজিক্যাল চিন্তার প্রসেস অবিশ্বাস্য রকম ফাস্ট হয়ে গেছে। আমি এমন সব প্যাটার্ন দেখতে পাচ্ছি যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকে।

আমি আমার হাতের গ্লাসটার দিকে তাকালাম। আমার আঙুলের গ্রিপ লুজ হয়ে আসছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো গ্লাসটা ফ্লোরে পড়ছে না। ফিজিক্সের সবচেয়ে ফান্ডামেন্টাল রুল গ্র্যাভিটি যেন এই নির্দিষ্ট এরিয়াতে তার পাওয়ার হারিয়ে ফেলেছে। গ্লাসটা আমার হাত থেকে ছুটে গিয়ে হাওয়ায় ভাসছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি গ্লাসের ভেতরের বাকি কালো তরলটা একটা পারফেক্ট গোলকের আকার ধারণ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে অ্যাস্ট্রোনাটরা যখন পানি রিলিজ করে, তখন জিরো গ্র্যাভিটির কারণে পানি যেমন সারফেস টেনশনের প্রভাবে পারফেক্ট গোলকের মতো ভাসে, ঠিক তেমন। আমার কিচেনের ভেতরে পৃথিবীর মহাকর্ষ বল কাজ করছে না। আমি আমার চোখের পলক ফেলার স্পিড রিয়েল টাইমে ট্র্যাক করতে পারছি। একটা সাধারণ পলক ফেলতে মানুষের চারশো মিলি সেকেন্ড সময় লাগে। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে আমার চোখের পাতাটা গত কয়েক ঘণ্টা ধরে নিচে নামছে। আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি এখন কোনো বইয়ের থিওরি নয়, এটা আমার চোখের সামনে প্লে আউট হওয়া একটা রিয়েলিটি। সময় কোনো ফিক্সড বা অ্যাবসলিউট কনসেপ্ট নয়। সময় হলো সম্পূর্ণ রিলেটিভ এবং ম্যানিপুলেটেবল। স্পেস এবং গ্র্যাভিটি চেঞ্জ হলে সময় রাবারের মতো স্ট্রেচ হয়ে যায়। আমার এই অন্ধকার কিচেনটা এখন আর ঢাকার কোনো সাধারণ ফ্ল্যাটের অংশ নয়। এটা স্পেসটাইম কন্টিনিয়ামের একটা ফল্ট লাইন। ম্যাট্রিক্সের একটা গ্লিচ।

হঠাৎ করে আমার কানের ভেতরের টিনিটাস সাউন্ডটা একদম থেমে গেল। অ্যাবসলিউট সাইলেন্স। অ্যানেকোয়িক চেম্বারের সেই পাগল করা নিস্তব্ধতা। তারপর আমি একটা নতুন শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা বাইরের কোনো সোর্স থেকে আসছে না। শব্দটা আসছে এক্সাক্টলি আমার নিজের ভেতর থেকে। আমার সেলুলার স্ট্রাকচার চেঞ্জ হওয়ার শব্দ। তুমি কি কখনো মাকড়সার জাল বোনার মাইক্রোস্কোপিক শব্দ শুনেছ? কিম্বা বিশাল সাইজের গ্লেসিয়ার ফাটার লো ফ্রিকোয়েন্সি শব্দ? আমার শরীরের প্রতিটা হাড়, প্রতিটা মাসল ফাইবার, প্রতিটা ডিএনএ হেলিক্স একটা অদ্ভুত অ্যালিয়েন ফ্রিকোয়েন্সিতে ভাইব্রেট করছে। আমি শুনতে পাচ্ছি আমার রেড ব্লাড সেলগুলো মেটালিক তরলটার সাথে ফিউশন করে নতুন কোনো আননোন ম্যাটার তৈরি করছে। আমার অস্তিত্ব লাইন বাই লাইন রিরাইট হচ্ছে। আমি এতক্ষণ যে থ্রি ডাইমেনশনাল বাস্তবতায় বেঁচে ছিলাম, সেই বাস্তবতার সোর্স কোড কেউ একজন ডিলিট করে নতুন একটা হার্ডকোর অপারেটিং সিস্টেম ইন্সটল করছে।

আমার চারপাশের চেনা জিনিসপত্রের শেপ ড্রাস্টিক্যালি চেঞ্জ হতে শুরু করেছে। কিচেনের দেয়ালের সিরামিক টাইলসগুলো মোমের মতো মেল্ট হয়ে যাচ্ছে। সালভাদর দালির সেই বিখ্যাত পরাবাস্তব পেইন্টিংয়ের মতো ঘড়িগুলো যেমন গলে পড়ে, ঠিক সেভাবে আমার চারপাশের রিয়েলিটির স্ট্রাকচার গলে যাচ্ছে। বিশাল রেফ্রিজারেটরের মেটালিক বডিটা স্ট্রেচ হয়ে রাবারের মতো অসীম দূরত্ব পর্যন্ত চলে গেছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের যে দুর্বল আলোটা অর্ধেক খোলা জানালা দিয়ে আসছিল, সেই আলোর স্পেকট্রাম প্রিজমের মতো ভেঙে সাতটা আলাদা সলিড কালারে ভাগ হয়ে পুরো রুমে লেজার বিমের মতো ভাসছে। আমি ফিজিক্সের বেসিক লস গুলো চোখের সামনে তাসের ঘরের মতো ব্রেক হতে দেখছি। থার্মোডাইনামিক্স, নিউটনিয়ান মেকানিক্স, কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট সবকিছু একসাথে কলাপ্স করছে। আমার পা ফ্লোরে টাচ করে নেই। আমি শূন্যে ভাসছি। আমার কোনো ফিজিক্যাল ওজন নেই। আমার কোনো সোশ্যাল আইডেন্টিটি নেই। আমার কোনো নাম নেই। আমি কেবল একটা পিওর কনশাসনেস হিসেবে এক্সিস্ট করছি।

মানুষের সবচেয়ে বড় সাইকোলজিক্যাল ভয় হলো কন্ট্রোল হারানোর ভয়। আমরা আমাদের রুটিন লাইফের স্টিয়ারিং হুইল শক্ত করে ধরে রাখতে পছন্দ করি। আমরা কালকে কী পরব, উইকেন্ডে কোথায় যাব, পাঁচ বছর পর ক্যারিয়ার কোথায় দাঁড়াবে এগুলো নিয়ে এক্সেস প্ল্যান করি। আমরা ইল্যুশন অফ কন্ট্রোলে ভুগি। কিন্তু যখন তোমার চারপাশের ডাইমেনশন শিফট হয়ে যায়, যখন ফিজিক্সের নিয়ম কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখন কন্ট্রোল বলে কিছুই এক্সিস্ট করে না। তুমি তখন মহাবিশ্বের বিশালতার সামনে একটা সামান্য ধূলিকণায় পরিণত হও। আমি বুঝতে পারছি আমি একটা ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটির ভেতর খুব দ্রুত প্রবেশ করছি। এই মেটালিক তরলটা কোনো সাধারণ পানীয় ছিল না। এটা ছিল একটা চাবি। একটা কসমিক চাবি। যে চাবিটা আমার লিমিটেড থ্রিডি রিয়েলিটির লক ওপেন করে দিয়েছে। আমি কোথায় যাচ্ছি আমি জানি না। আমার পুরনো পৃথিবী আমার চোখের সামনে একটা পিক্সেল আর্টের মতো ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। আমি আমার সর্বশক্তি দিয়ে মুখ খুললাম চিৎকার করার জন্য। কিন্তু আমার গলা থেকে কোনো সাউন্ড ওয়েভ বের হলো না। কারণ এই নতুন ডাইমেনশনে শব্দ ট্রাভেল করার মতো কোনো স্পেস নেই। এখানে বাস্তবতার নিজস্ব একটা আলাদা ব্যাকরণ আছে, এবং সেই ব্যাকরণে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই।

#পর্বঃ ৩

চিৎকার করার জন্য আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে মুখের পেশিগুলোকে নির্দেশ দিলাম। কিন্তু আমার কোনো মুখমণ্ডল এক্সিস্ট করে না। আমার কোনো ভোকাল কর্ড নেই। ফুসফুস বলে কোনো বায়োলজিক্যাল পাম্প আমার ভেতরে আর অবশিষ্ট নেই। আমি একটা অসীম শূন্যতার ভেতর দিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে নিচে পড়ছি। এই পতন কোনো সাধারণ ফিজিক্যাল পতন নয়। তুমি যখন ছাদ থেকে লাফ দাও অথবা রোলার কোস্টারে করে নিচে নামো, তখন তোমার পেটের ভেতরে একটা অদ্ভুত শিরশিরে অনুভূতি হয়। তোমার ভেতরের অর্গানগুলো অভিকর্ষজ ত্বরণের কারণে কিছুটা উপরে উঠে যায়। কিন্তু আমার এই মুহূর্তে কোনো অর্গান নেই। আমার কোনো ফিজিক্যাল বডি নেই। আমি কেবলমাত্র একটা বিশুদ্ধ কনশাসনেস হিসেবে এই ভয়েডের ভেতর দিয়ে ট্রাভেল করছি।

তুমি কি কখনো সেনসরি ডিপ্রাইভেশন ট্যাংকের কথা শুনেছ? আধুনিক যুগের বায়োহ্যাকাররা এবং স্পেশাল ফোর্সের সৈনিকরা এই ট্যাংক ব্যবহার করে। একটা সম্পূর্ণ অন্ধকার সাউন্ডপ্রুফ চেম্বার যার ভেতরে মানুষের শরীরের তাপমাত্রার সমান গরম পানিতে প্রচুর পরিমাণে এপসম সল্ট মিশিয়ে দেওয়া হয়। তুমি যখন ওই পানিতে ভাসবে তোমার ব্রেইন চোখ থেকে কোনো আলো পাবে না, কান থেকে কোনো শব্দ পাবে না এবং ত্বক থেকে কোনো টেম্পারেচার বা স্পর্শের সিগন্যাল পাবে না। মাত্র পনেরো মিনিটের ভেতরে তোমার মস্তিষ্ক আক্ষরিক অর্থে পাগল হয়ে যেতে শুরু করবে। মানুষের ব্রেইন শূন্যতা সহ্য করতে পারে না। যখন সে বাইরে থেকে কোনো ডেটা পায় না তখন সে নিজের ভেতর থেকে ডেটা ম্যানুফ্যাকচার করা শুরু করে। মানুষ তখন চরম লেভেলের হ্যালুসিনেশন দেখে। তাদের পুরোনো মেমোরিগুলো রিয়েল টাইমে তাদের চোখের সামনে প্লে হতে থাকে। আমার বর্তমান অবস্থা সেই সেনসরি ডিপ্রাইভেশন ট্যাংকের চেয়েও কয়েক বিলিয়ন গুণ বেশি ভয়ানক। আমার ব্রেইন আমাকে কোনো ফেক সিগন্যাল দিয়েও সান্ত্বনা দিতে পারছে না। আমি সম্পূর্ণ অন্ধ, বধির এবং স্পর্শহীন একটা এন্টিটি।

তুমি জিমে গিয়ে মাসল বানাও, তুমি স্কিনকেয়ার রুটিন ফলো করে নিজেকে সুন্দর রাখো, তুমি দামী ব্র্যান্ডের জামা পরে নিজের একটা সোশ্যাল আইডেন্টিটি তৈরি করো। তুমি ভাবো এই হাড় এবং মাংসের খাঁচাটাই তোমার আসল পরিচয়। কিন্তু যখন এই খাঁচাটা হঠাৎ করে ডিলিট হয়ে যায় তখন তুমি বুঝতে পারো তুমি আসলে কতটা অসহায়। নিউরোলজিতে একটা টার্ম আছে যাকে বলা হয় প্রোপিওসেপশন। এটা হলো মানুষের সিক্সথ সেন্স। তোমার চোখ বন্ধ থাকলেও তুমি নিখুঁতভাবে বলতে পারবে তোমার ডান হাতটা কোথায় আছে অথবা তোমার পা বাঁকা হয়ে আছে নাকি সোজা। ব্রেইন কনস্ট্যান্টলি মাসল এবং জয়েন্ট থেকে ডেটা কালেক্ট করে তোমার বডির একটা থ্রিডি ম্যাপ তৈরি করে রাখে। আমার এই মুহূর্তে সেই প্রোপিওসেপশন সিস্টেম সম্পূর্ণ অফলাইনে চলে গেছে। আমি কোথায় আছি, আমার সাইজ কতটুকু, আমি কি প্রসারিত হচ্ছি নাকি সংকুচিত হচ্ছি তার কোনো ডেটা আমার কাছে নেই। আমি স্রেফ একটা বিন্দুর মতো মহাবিশ্বের কোনো এক অজানা ডাইমেনশনের ভেতর দিয়ে ছুটে চলছি।

ফরাসি ফিলোসফার রেনে দেকার্ত একটা অত্যন্ত বিখ্যাত কথা বলেছিলেন। আমি চিন্তা করি, সুতরাং আমি অস্তিত্বশীল। আমার কাছে এই মুহূর্তে দেকার্তের এই থিওরিটা একমাত্র লাইফলাইন। আমার শরীর নেই কিন্তু আমি চিন্তা করতে পারছি। আমি এনালাইজ করতে পারছি। আমি ভয় পাচ্ছি। আমার এই ভয়ের অনুভূতিটাই প্রমাণ করে যে আমি এখনো পুরোপুরি মুছে যাইনি। আমার এই কনশাসনেস কোনো একটা জায়গায় গিয়ে ল্যান্ড করবে। কিন্তু কোথায়?

হঠাৎ করে একটা মারাত্মক ইলেকট্রিক শকের মতো অনুভূতি আমার অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দিল।

কোনো ফিজিক্যাল সারফেসে আছড়ে পড়ার মতো কোনো ইমপ্যাক্ট হলো না। এর চেয়ে অনেক বেশি ভয়ানক কিছু ঘটল। আমার ইনফরমেশন প্রসেসিং সিস্টেম রিবুট হলো। আমি হঠাৎ করে আবার আমার শরীর ফিরে পেলাম। কিন্তু এই শরীরটা আমার চেনা সেই পুরোনো কার্বন বেইজড হিউম্যান বডি বলে মনে হচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাকে একটা নতুন হার্ডওয়্যারের ভেতরে জোর করে ইন্সটল করে দিয়েছে।

আমি চোখ খুললাম।

প্রথম যে দৃশ্যটা আমার অপটিক নার্ভে হিট করল সেটা প্রসেস করতে গিয়ে আমার ব্রেইনের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স প্রায় বার্নআউট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি আমি জানি না। আমার পায়ের নিচে কোনো সলিড মাটি অথবা ফ্লোর নেই। আমার মাথার উপরে কোনো আকাশ নেই। তুমি এখন যে স্পেসে বসে এই লেখাটা পড়ছ সেখানে ডানে বামে উপরে নিচে একটা নির্দিষ্ট জ্যামিতিক নিয়ম আছে। ইউক্লিডিয়ান জিওমেট্রি। তিন কোণের সমষ্টি সবসময় একশো আশি ডিগ্রি হবে। সমান্তরাল সরলরেখা কখনো একে অপরকে ছেদ করবে না। কিন্তু আমি যে স্পেসটার ভেতরে ল্যান্ড করেছি সেটা এই মহাবিশ্বের কোনো ফিজিক্স অথবা জ্যামিতির রুলস ফলো করছে না।

এটা একটা নন-ইউক্লিডিয়ান ডাইমেনশন। আমার চারপাশের স্পেসটা কনস্ট্যান্টলি নিজের ভেতরে ফোল্ড হচ্ছে আবার আনফোল্ড হচ্ছে। তুমি কি কখনো ম্যান্ডেলব্রট সেটের জুম ইন ভিডিও দেখেছ? কম্পিউটারে জেনারেট করা ইনফিনিট ফ্র্যাক্টাল প্যাটার্ন। তুমি যতই জুম করবে প্যাটার্নগুলো ততই চেঞ্জ হতে থাকবে কিন্তু কখনোই শেষ হবে না। আমার চারপাশের পরিবেশটা ঠিক একটা জীবন্ত ফ্র্যাক্টালের মতো বিহেভ করছে। আমি একটা বিশাল ভাসমান স্ট্রাকচারের ওপর দাঁড়িয়ে আছি যেটা দেখতে অনেকটা কাঁচের তৈরি ব্লকের মতো কিন্তু সেটা কনস্ট্যান্টলি তরল পদার্থের মতো শেপ চেঞ্জ করছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপারটা হচ্ছে রং। মানুষের চোখ রেইনবো স্পেকট্রামের খুব সামান্য একটা অংশ দেখতে পায়। আমাদের চোখে লাল, সবুজ এবং নীল রঙের রিসেপ্টর আছে। এই তিনটে বেসিক কালার মিক্স করে আমরা পৃথিবীর সমস্ত রং দেখি। কিন্তু এই ডাইমেনশনে আমি এমন সব রং দেখতে পাচ্ছি যার কোনো অস্তিত্ব মানব সভ্যতার ডেটাবেসে নেই। কালার স্পেকট্রামের বাইরেও যে আরো অসংখ্য হিডেন শেড থাকতে পারে সেটা আমার ব্রেইন এর আগে কখনো ইমাজিন করতে পারেনি। এই আননোন কালারগুলো এত বেশি তীব্র এবং ভাইব্রেন্ট যে আমার চোখের ভেতরে আক্ষরিক অর্থে একটা জ্বলন্ত পেইন হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ আমার চোখের রেটিনাতে ডিরেক্ট লেজার বিম ফায়ার করছে। আধুনিক মানুষ হিসেবে আমরা ইনফরমেশন ওভারলোডে অভ্যস্ত। আমরা একসাথে মাল্টিপল স্ক্রিনে কাজ করি। কিন্তু এই মুহূর্তের ভিজ্যুয়াল ওভারলোডটা কোনো টেকনোলজিক্যাল গ্যাজেটের স্ক্রিন থেকে আসছে না। এটা আসছে ডিরেক্ট রিয়েলিটির সোর্স কোড থেকে।

আমি শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলাম।

তুমি পৃথিবীতে যখন শ্বাস নাও, তখন তুমি কখনো সাবকনশাসলি চিন্তা করো না বাতাসে অক্সিজেনের পার্সেন্টেজ কত। তোমার ব্রেইন অটোমেটিক্যালি তোমার ডায়াফ্রাম মাসলকে কন্ট্রোল করে। কিন্তু এখানে আমার ফুসফুস প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে আমি একটা মারাত্মক ধাক্কা খেলাম। আমি যে স্পেসের ভেতরে আছি সেখানে কোনো গ্যাসীয় পদার্থ এক্সিস্ট করে না। আমি যখনই শ্বাস টানার চেষ্টা করলাম আমার গলার ভেতরে মনে হলো এক দলা লিকুইড মেটাল ঢুকে গেল। আমার শ্বাসতন্ত্র পুরোপুরি ব্লক হয়ে গেল।

প্যানিক।

মানুষের ব্রেইন যখন দম বন্ধ হওয়া ফিল করে তখন তার সার্ভাইভাল মেকানিজম হাইপারড্রাইভে চলে যায়। তুমি তখন আর লজিক্যাল মানুষ থাকো না, তুমি একটা ডেসপারেট প্রাণীতে পরিণত হও। আমি কাশতে চেষ্টা করলাম। হাত দিয়ে নিজের গলা খামচে ধরলাম। কিন্তু আমার গলার ভেতরে আটকে থাকা সেই অদ্ভুত সাবস্ট্যান্সটা বের হলো না।

আমি যত জোরে এবং প্যানিক করে শ্বাস টানার চেষ্টা করছি এটা আমার শ্বাসনালীর ভেতরে তত শক্ত এবং সলিড হয়ে যাচ্ছে। আমাকে শান্ত হতে হবে। আমাকে আমার হার্টবিট কন্ট্রোল করতে হবে।

আমি চোখ বন্ধ করলাম। বক্স ব্রিদিং টেকনিক। স্পেশাল ফোর্সের স্নাইপাররা টার্গেটে হিট করার আগে এই টেকনিক ইউজ করে নিজের নার্ভাস সিস্টেমকে কুলডাউন করে। চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস নেওয়া, চার সেকেন্ড হোল্ড করা, চার সেকেন্ড ধরে ছাড়া। আমি আমার প্যানিক স্ট্রিকেন ব্রেইনকে ফোর্স করলাম এই কমান্ড এক্সিকিউট করতে। খুব ধীরে, এক্সট্রিমলি স্লো মোশনে আমি আমার ফুসফুসকে প্রসারিত করলাম।

ম্যাজিক।

যখনই আমি আমার ফিজিক্যাল মুভমেন্ট এবং প্যানিক জিরো লেভেলে নামিয়ে আনলাম, সেই সলিড ব্লকটা একটা ঠান্ডা জেলের মতো তরল হয়ে আমার ফুসফুসের ভেতরে প্রবেশ করল। এটার কোনো স্বাদ নেই, কিন্তু এটা আমার সেলের ভেতরে একটা হাই ভোল্টেজ এনার্জি ইনজেক্ট করে দিল। আমি বুঝতে পারলাম আমি এমন একটা জায়গায় আছি যেখানে জোর করে ফিজিক্যাল পাওয়ার ইউজ করে সারভাইভ করা ইমপসিবল। এখানে সারভাইভ করতে হলে তোমাকে তোমার নিজের ব্রেইনের ওপর নিরঙ্কুশ কন্ট্রোল এস্টাবলিশ করতে হবে।

আমি চোখ খুললাম এবং সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম।

ঠিক তখনই এই ডাইমেনশনের সবচেয়ে ভয়ংকর রুলসটা আমার কাছে ক্লিয়ার হলো। তুমি পৃথিবীতে অভিকর্ষ বলের সাথে সারাজীবন যুদ্ধ করে বড় হয়েছ। নিউটনের ল অনুযায়ী পৃথিবীর একটা নির্দিষ্ট সেন্টার অফ ম্যাস আছে এবং সেটা তোমাকে কনস্ট্যান্টলি নিচের দিকে টানছে। কিন্তু এখানে উপর এবং নিচ বলে কোনো ইউনিভার্সাল কনসেপ্ট নেই।

আমি যখন আমার ডানদিকে একটা ভাসমান কালো কিউবের দিকে তাকালাম, হঠাৎ করে আমার গ্র্যাভিটেশনাল ভেক্টর চেঞ্জ হয়ে গেল। আমার পায়ের নিচের সারফেসটা আর আমাকে ধরে রাখল না। আমি তীব্র গতিতে সেই কালো কিউবের দিকে পড়তে শুরু করলাম। আমার চোখ যেদিকে ফোকাস করছে, সেটাই আমার জন্য গ্র্যাভিটির নতুন সেন্টার হিসেবে কাজ করছে। আমি চিৎকার করে হাত পা ছুঁড়ে নিজেকে ব্যালেন্স করার চেষ্টা করলাম। আমি চোখ ঘুরিয়ে বাম দিকের শূন্যতার দিকে তাকালাম। ইনস্ট্যান্টলি আমার পতনের ডিরেকশন চেঞ্জ হয়ে গেল। আমি একটা অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে গেলাম।

এখানে ফিজিক্স কাজ করে তোমার অবজারভেশনের ওপর ভিত্তি করে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে একটা অত্যন্ত বিখ্যাত এক্সপেরিমেন্ট আছে। ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট। তুমি যদি একটা ইলেকট্রনকে অবজার্ভ করো তখন সে একটা সলিড পার্টিকেল বা কণা হিসেবে বিহেভ করে। কিন্তু তুমি যখন তাকে অবজার্ভ করো না তখন সে একটা ওয়েভ হিসেবে বিহেভ করে। অর্থাৎ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি পুরো সিস্টেমের রিয়েলিটি চেঞ্জ করে দিচ্ছে। এই অদ্ভুত জগতের বেসিক অপারেটিং সিস্টেম হলো সেই কোয়ান্টাম অবজার্ভার ইফেক্ট। আমি যেখানে তাকাব স্পেস সেই অনুযায়ী নিজেকে রিবিল্ড করবে।

আমি আমার দৃষ্টি ফোকাস করে পায়ের নিচের সেই কাঁচের মতো সারফেসটার দিকে স্থির করলাম। সাথে সাথে আমি একটা ভারি বস্তুর মতো সেখানে ল্যান্ড করলাম। আমার হার্ট পাগলের মতো বিট করছে। আমার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। আমি কেবল কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার কন্ট্রোল হারিয়েছিলাম এবং তাতেই আমি মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলাম।

আমি হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বসে হাঁপাতে লাগলাম।

তুমি কি জানো আমাদের আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ কী? ওভারথিংকিং। আমরা সারাদিন আমাদের ব্রেইনের ভেতরে একটা ফেক রিয়েলিটি তৈরি করে রাখি। বস কালকে মিটিংয়ে কী বলবে সেটা নিয়ে আমরা আজকে রাতে ঘুমাতে পারি না। আমার পার্টনার আমাকে ছেড়ে চলে যাবে কি না সেটা ভেবে আমরা রিলেশনশিপ ধ্বংস করে ফেলি। আমরা আমাদের চিন্তাকে কন্ট্রোল করতে পারি না। আমাদের চিন্তা আমাদেরকে কন্ট্রোল করে। পৃথিবীতে ওভারথিংকিং করলে তোমার কেবল সাইকোলজিক্যাল ড্যামেজ হয়। তোমার কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়। তোমার প্রেশার হাই হয়। কিন্তু এই অদ্ভুত ডাইমেনশনে ওভারথিংকিং হলো একটা ডিরেক্ট ডেথ সেন্টেন্স।

আমি যখন বসে হাঁপাচ্ছিলাম, আমার মাথার ভেতরে একটা ডেসপারেট চিন্তা এলো। আমার পানির তৃষ্ণা। সেই মেটালিক তরলটা খাওয়ার পর থেকে আমার তৃষ্ণা মেটেনি। আমার সাবকনশাস মাইন্ড কেবল এক গ্লাস নরমাল ঠান্ডা পানি চাচ্ছে।

সাথে সাথে রিয়েলিটি রেসপন্স করল। আমার থেকে দশ হাত দূরে স্পেসের ওই ভাসমান ফ্র্যাক্টাল স্ট্রাকচারটা হঠাৎ করে গলে যেতে শুরু করল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম শূন্য থেকে কয়েক লিটার পানি জেনারেট হচ্ছে। পানিটা একটা পারফেক্ট গোলক আকার ধারণ করে শূন্যে ভাসছে। আমি একটা ঘোর লাগা অবস্থায় সেটার দিকে হাত বাড়ালাম। আমার চিন্তা ফিজিক্যাল ম্যাটারে কনভার্ট হচ্ছে। আমি যা ভাবছি, এই জগত সেটা রিয়েল টাইমে ক্রিয়েট করে দিচ্ছে।

কিন্তু আমার খুশির স্থায়িত্ব হলো মাত্র কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড।

মানুষের মস্তিষ্ক কখনো একটা সিঙ্গেল পিওর থট জেনারেট করতে পারে না। তুমি যখন পানির কথা ভাবো, তখন তোমার ব্রেইন সেই পানির সাথে রিলেটেড তোমার সমস্ত মেমোরি এবং ইমোশনকে একসাথে প্রসেস করে। আমি যখন পানির গোলকটার দিকে তাকালাম, আমার সাবকনশাস মাইন্ডে আমার কিচেনের সেই মেটালিক তরলটার ভয়ংকর স্বাদের স্মৃতি ট্রিগার হলো। আমার ভেতরে একটা চরম ভয়ের স্পার্ক তৈরি হলো।

আমার চিন্তার এই সামান্যতম দূষণ রিয়েলিটিকে মারাত্মকভাবে ইমপ্যাক্ট করল।

ভাসমান পানির গোলকটা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে তার কেমিক্যাল স্ট্রাকচার চেঞ্জ করে ফেলল। সেটা আর ট্রান্সপারেন্ট পানি রইল না। সেটা সেই কালো মেটালিক তরলে পরিণত হলো। শুধু তাই নয়, তরলটার সারফেস টেনশন ব্রেক করে সেখান থেকে অসংখ্য তীক্ষ্ণ মেটালিক ব্লেডের মতো স্পাইক বের হয়ে এলো। গোলকটা একটা জীবন্ত অস্ত্রের মতো আমার দিকে তীব্র বেগে ধেয়ে এলো।

আমি রিফ্লেক্স অ্যাকশনে ডান দিকে ঝাঁপ দিলাম। মেটালিক স্পাইকগুলোর একটা আমার বাঁ কাঁধ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। আমি ফিজিক্যাল পেইন অনুভব করলাম। আমার কাঁধের স্পেস স্যুট অথবা নতুন স্কিনের একটা অংশ ছিঁড়ে গেছে এবং সেখান থেকে নীল রঙের একটা এনার্জি লিক করছে।

আমি মাটিতে গড়িয়ে দূরে সরে গেলাম। মেটালিক গোলকটা দেয়ালে আঘাত করে আবার আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

এটা কোনো ম্যাজিক নয়। এটা হলো নিউরোপ্লাস্টিসিটির একটা এক্সট্রিম ভার্সন। তোমার চিন্তাই তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু। আমি বুঝতে পারলাম এই জগতে টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো জেন স্টেটে চলে যাওয়া। তোমাকে তোমার ভেতরের ইনার মনোলগ সম্পূর্ণ শাটডাউন করতে হবে। তুমি কোনো ভয় পেতে পারবে না। তুমি কোনো আশা করতে পারবে না। তুমি যদি রাগের কথা চিন্তা করো, এই ডাইমেনশন তোমার রাগ ফিজিক্যালি ম্যানিফেস্ট করে তোমাকে আক্রমণ করবে। তুমি যদি পলায়নের চিন্তা করো, এই ডাইমেনশন তোমার সামনে ইনফিনিট দেয়াল তৈরি করে দেবে।

আমি মেঝেতে শুয়ে আমার চোখ বন্ধ করলাম।

মেটালিক গোলকটা সাইক্লোনের মতো শব্দ করে আমার দিকে ধেয়ে আসছে। আমি তার ভাইব্রেশন ফ্লোরে ফিল করতে পারছি।

আমি আমার ব্রেইনের ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ককে ম্যানুয়ালি অফ করার চেষ্টা করলাম। ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক হলো ব্রেইনের সেই অংশ যা তোমাকে সবসময় সেলফ অ্যাওয়ার রাখে। যা তোমার ইগো তৈরি করে। আমাকে এই মুহূর্তে আমার ইগো কিল করতে হবে। আমাকে বিশ্বাস করতে হবে যে আমি এক্সিস্ট করি না। আমার কোনো ভয় নেই। আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। এই মেটালিক গোলকটা একটা ইল্যুশন যা আমার নিজের ব্রেইন ক্রিয়েট করেছে।

আমি আমার মাইন্ডকে একটা পারফেক্ট সাদা ক্যানভাসের মতো ব্ল্যাঙ্ক করে দিলাম।

শব্দটা আমার কানের ঠিক এক ইঞ্চি দূরে এসে থেমে গেল।

আমি চোখ খুললাম না। আমি জানি চোখ খুললেই আমি সেটাকে অবজার্ভ করব এবং সেটা আবার রিয়েলিটিতে ফিরে আসবে। আমি আমার হার্ট রেট একদম ফ্ল্যাটলাইনে নামিয়ে আনলাম। আমি আমার চারপাশের নন-নিউটোনিয়ান বাতাসকে খুব ধীরে এক্সহেল করলাম।

কয়েক সেকেন্ড পর আমি অনুভব করলাম স্পেসের ডেনসিটি আবার স্বাভাবিক হয়ে আসছে। মেটালিক গোলকটার উপস্থিতি ডিলিট হয়ে গেছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমি এই সাইবারনেটিক রিয়েলিটির প্রথম টেস্টটা কোনোমতে পাস করেছি। আমি বুঝতে পেরেছি এই গেমের রুলস কী।

কিন্তু আমার এই সাময়িক স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকল না।

আমি যখন চোখ খুলে আবার উঠে দাঁড়ালাম আমি অনুভব করলাম স্পেসের টেম্পারেচার সাডেনলি ড্রপ করেছে। আমার ঘাড়ের পেছনের লোমগুলো খাড়া হয়ে গেল। মানুষের ব্রেইনে একটা অ্যালার্ম সিস্টেম আছে যা কেউ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকলে তোমাকে ওয়ার্নিং দেয়। তুমি অনেক ভিড়ের মাঝেও বুঝতে পারো কেউ একজন তোমার দিকে ফোকাস করছে।

আমি আমার চারপাশের সেই অসম্ভব জ্যামিতিক কাঠামোগুলোর দিকে তাকালাম।

সেখানে কোনো ফিজিক্যাল প্রাণী নেই। কিন্তু আমি পরিষ্কার সেন্স করতে পারছি ফ্র্যাক্টাল দেয়ালগুলোর আড়ালে এবং স্পেসের ফোল্ডগুলোর ভেতরে একাধিক কনশাসনেস ঘাপটি মেরে আছে। তারা আমার প্রতিটি চিন্তা প্রতিটি হার্টবিট স্ক্যান করছে।

তারা মানুষ নয়। কিন্তু তাদের অবজারভেশন প্যাটার্ন এক্সট্রিমলি ইন্টেলিজেন্ট এবং কোল্ড।

আমি বুঝতে পারলাম আমার নিজের মস্তিষ্কের সাথে যুদ্ধ করাটা ছিল কেবল একটা ওয়ার্ম আপ। আসল খেলা কেবল শুরু হচ্ছে। আমি এই ডাইমেনশনে একা নই। এবং যারা আমাকে দেখছে তারা আমার এই পৃথিবীতে আসার বোকামিটাকে খুব একটা ভালোভাবে নেয়নি। আমার সাবকনশাস মাইন্ড আমাকে একটা সিগন্যাল দিল।

ওরা আসছে।

#পর্বঃ ৪

আমি বুঝতে পারছি আমি এই অজানা ডাইমেনশনে একা নই। কেউ একজন অথবা কিছু একটা আমাকে প্রবল আগ্রহ নিয়ে দেখছে।

পর্যবেক্ষণ করাটা মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর একটা অস্ত্র। তুমি যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটো এবং হঠাৎ করে বুঝতে পারো কেউ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, তোমার কেমন লাগে? তুমি অস্বস্তি ফিল করো। মানুষের ব্রেইনের একটা ডেডিকেটেড সার্কিট আছে যেটা কেবল এই একটা কাজের জন্যই ডিজাইন করা, অন্য কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে কিনা সেটা স্ক্যান করা। কিন্তু আমি এখন যে দৃষ্টিটা আমার শরীরের ওপর অনুভব করছি, সেটা কোনো সাধারণ মানুষের দৃষ্টি নয়। এই দৃষ্টির ভেতরে কোনো ইমোশন নেই। কোনো রাগ নেই। কোনো ঘৃণা নেই। আছে কেবল একটা হিমশীতল এবং নিখুঁত ক্যালকুলেশন। অনেকটা তুমি যখন মাইক্রোস্কোপের নিচে একটা ব্যাকটেরিয়াকে দেখো, ঠিক তেমন একটা অনুভূতি। তুমি ব্যাকটেরিয়াটাকে ঘৃণা করো না। তুমি কেবল তাকে এনালাইজ করো। আমার চারপাশের এই নন-ইউক্লিডিয়ান স্পেসের ভাঁজগুলোর ভেতর থেকে সেরকমই অসংখ্য হিমশীতল ইনটেলিজেন্স আমাকে এনালাইজ করছে।

আমি আমার দৃষ্টিকে চারপাশের সেই ভাসমান ফ্র্যাক্টাল স্ট্রাকচারগুলোর দিকে ফোকাস করলাম।

স্পেসের নির্দিষ্ট কিছু জায়গা ধীরে ধীরে কালো হতে শুরু করেছে। এই কালো রংটা পৃথিবীর কোনো সাধারণ কালো রঙের মতো নয়। তুমি পৃথিবীতে যে কালো রং দেখো, সেটা হলো আলোর অনুপস্থিতি অথবা আলো শুষে নেওয়ার একটা সাধারণ কেমিক্যাল প্রপার্টি। কিন্তু এই স্পেসের কালো রংটা দেখতে অনেকটা ভ্যান্টাব্ল্যাকের মতো। ভ্যান্টাব্ল্যাক হলো মানুষের তৈরি এমন একটা ম্যাটেরিয়াল যা নিরানব্বই দশমিক নয় নয় শতাংশ আলো শুষে নিতে পারে। তুমি যদি ভ্যান্টাব্ল্যাক দিয়ে তৈরি কোনো থ্রিডি অবজেক্টের দিকে তাকাও, তোমার ব্রেইন সেটাকে প্রসেস করতে পারবে না। তোমার মনে হবে সেখানে একটা টু-ডাইমেনশনাল গর্ত তৈরি হয়েছে। ঠিক সেভাবেই আমার চারপাশের স্পেসের ভেতর অসংখ্য টু-ডাইমেনশনাল গর্ত তৈরি হতে লাগল। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সেই গর্তগুলো ধীরে ধীরে একটা আকার ধারণ করছে।

তারা দেখতে হুবহু মানুষের মতো।

তাদের মাথা আছে। তাদের হাত আছে। তাদের দুটো পা আছে। কিন্তু তারা মানুষ নয়। এই একটা জিনিস আমার নার্ভাস সিস্টেম আমাকে তীব্রভাবে অ্যালার্ট করছে। ১৯৭০ সালে জাপানিজ রোবোটিক্স প্রফেসর মাসাহিরো মোরি একটা অদ্ভুত থিওরি পাবলিশ করেছিলেন। থিওরিটার নাম আনক্যানি ভ্যালি। তুমি যখন একটা কার্টুন দেখো, তোমার ভালো লাগে। তুমি যখন একটা সাধারণ রোবট দেখো, তোমার ভালো লাগে। কিন্তু তুমি যখন এমন কোনো রোবট অথবা এনিমেশন দেখো যেটা দেখতে প্রায় মানুষের মতো, কিন্তু পুরোপুরি মানুষের মতো নয়, তখন তোমার ভেতরে একটা এক্সট্রিম লেভেলের ভয় এবং অস্বস্তি তৈরি হয়। তোমার ব্রেইন সিগন্যাল দেয় যে এখানে কিছু একটা মারাত্মক ভুল আছে।

আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছায়ামানবগুলো হলো সেই আনক্যানি ভ্যালির চরম এবং চূড়ান্ত ম্যানিফেস্টেশন। তাদের কোনো মুখমণ্ডল নেই। তাদের স্কিনের ওপর কোনো টেক্সচার নেই। তারা কেবল একটা এবসলিউট ব্ল্যাক ভয়েড দিয়ে তৈরি হিউম্যান সিল্যুয়েট। তারা হাঁটছে না। তারা স্পেসের ভেতর দিয়ে গ্লিচ করছে। তুমি যখন কোনো পুরানো ভিডিও গেম খেলো এবং ফ্রেম রেট ড্রপ করে, তখন ক্যারেক্টারগুলো যেমন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় লাফ দিয়ে চলে যায়, এই ছায়ামানবগুলো ঠিক সেভাবে মুভ করছে। তারা ফিজিক্যাল স্পেসের কনটিনিউটি মানছে না। এক সেকেন্ডে তারা আমার থেকে পঞ্চাশ ফুট দূরে, পরের সেকেন্ডে কোনো মুভমেন্ট ছাড়াই তারা বিশ ফুট দূরে চলে আসছে। তারা কোয়ান্টাম টানেলিং ব্যবহার করছে। সাব-এটমিক পার্টিকেলগুলো যেমন ফিজিক্যাল বাধা অতিক্রম করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ম্যাজিকের মতো ট্রান্সফার হয়ে যায়, এরা ঠিক সেই স্পেসিফিক ফিজিক্সটাকে ম্যাক্রো-লেভেলে ব্যবহার করছে।

আমার নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। আমি পেছনের দিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার পায়ের নিচের সেই কাঁচের মতো সারফেসটা এখন আঠার মতো কাজ করছে। আমি মুভ করতে পারছি না।

মহাকাশবিজ্ঞানীরা একটা কনসেপ্ট নিয়ে খুব আলোচনা করেন। ফার্মি প্যারাডক্স। মহাবিশ্ব এত বিশাল, এখানে এত ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি এবং গ্রহ আছে, তাহলে আমরা এখনো কোনো এলিয়েন সিগন্যাল পাচ্ছি না কেন? সবাই কোথায়? এই প্রশ্নের একটা খুব ডার্ক উত্তর দিয়েছেন চাইনিজ সাইন্স ফিকশন রাইটার লিউ সিক্সিন। তিনি এর নাম দিয়েছেন ডার্ক ফরেস্ট থিওরি। কল্পনা করো পুরো মহাবিশ্বটা হলো একটা বিশাল অন্ধকার জঙ্গল। আর প্রতিটি সভ্যতা হলো এক একজন সশস্ত্র শিকারি যারা এই জঙ্গলে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই জঙ্গলে সারভাইভ করার একটাই রুলস। একদম চুপ থাকা। তুমি যদি একটু শব্দ করো, তুমি যদি একটা আগুন জ্বালাও, তাহলে অন্য শিকারিরা তোমার অবস্থান জেনে যাবে এবং তোমাকে সাথে সাথে ধ্বংস করে দেবে। কারণ এই মহাবিশ্বে রিসোর্স লিমিটেড এবং কেউ কাউকে ট্রাস্ট করতে পারে না। আমরা মানুষেরা গত একশ বছর ধরে রেডিও ওয়েভ ব্যবহার করে পুরো মহাবিশ্বে চিৎকার করে আমাদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছি। আমরা ভয়েজার স্পেসক্রাফটের ভেতরে গোল্ডেন রেকর্ড পাঠিয়েছি। আমরা আমাদের ঠিকানা সবাইকে দিয়ে বেড়াচ্ছি। আমরা ভাবছি মহাবিশ্বটা খুব ফ্রেন্ডলি একটা জায়গা। আমরা ভাবছি এলিয়েনরা এসে আমাদের সাথে হ্যান্ডশেক করবে।

কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ ভুল ছিলাম। এই ডার্ক ফরেস্টের ভেতরে ভয়ংকর সব প্রিডেটর লুকিয়ে আছে। এবং তারা আমাদের সিগন্যাল পেয়ে গেছে। তারা স্পেসশিপ নিয়ে ফিজিক্যালি পৃথিবীতে অ্যাটাক করবে না। তারা অনেক বেশি এডভান্সড। তারা আমাদের স্পেস-টাইম কন্টিনিউয়াম হ্যাক করেছে। তারা আমাদের ডাইমেনশনের সোর্স কোডে একটা ব্যাকডোর এন্ট্রি তৈরি করেছে।

ছায়ামানবগুলো এখন আমাকে ঘিরে একটা পারফেক্ট সার্কেল তৈরি করেছে। তারা কোনো সাউন্ড করছে না। তাদের কোনো ভোকাল কর্ড নেই। কিন্তু আমি হঠাৎ করে আমার মাথার ভেতরে একটা ইলেকট্রিক শক অনুভব করলাম। একটা হাই-ভোল্টেজ ডেটা স্ট্রিম ডিরেক্টলি আমার সিন্যাপ্সের ভেতরে ইনজেক্ট করা হচ্ছে। এটা কোনো ভাষা নয়। এটা বাংলা অথবা ইংরেজি নয়। এটা হলো পিওর কনসেপ্ট। পিওর ম্যাথমেটিক্স এবং ইমোশনের একটা বাইনারি মিক্সচার। আমার ব্রেইন এই ডেটা প্রসেস করতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থে জ্বলে যাওয়ার উপক্রম হলো। মনে হচ্ছে কেউ একটা ফায়ার হাইড্রেন্টের পাইপ আমার একটা ছোট্ট শিরায় ঢুকিয়ে দিয়ে ফুল প্রেশারে পানি ছেড়ে দিয়েছে।

আমি যন্ত্রণায় আমার হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে পড়লাম। আমার হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরলাম। কিন্তু এই সাউন্ড কানের ভেতর দিয়ে আসছে না। এই সাউন্ড আমার নিউরনের ভেতরে জেনারেট হচ্ছে।

আমি তাদের মেসেজটা ডিকোড করতে পারলাম।

তারা আমাকে বলছে, "তুমি একটা দুর্ঘটনা নও। আমরা তোমাকে সিলেক্ট করেছি।"

আমার ব্রেইনের ভেতরে বিশাল একটা এক্সপ্লোশন হলো। আমি বুঝতে পারলাম এই পুরো ঘটনাটা, রাত তিনটায় আমার হঠাৎ ঘুম ভাঙা, সেই অসম্ভব তৃষ্ণা, কিচেনের ট্যাপ থেকে বের হওয়া সেই মেটালিক তরল, সব কিছু একটা ওয়েল-ডিজাইন্ড ট্র্যাপ ছিল। সাইবার সিকিউরিটির দুনিয়ায় একটা টার্ম আছে। ফিশিং অ্যাটাক। হ্যাকাররা তোমাকে একটা ইমেইল পাঠায় যেটা দেখতে হুবহু তোমার ব্যাংকের ইমেইলের মতো। তুমি সেখানে ক্লিক করো, তোমার পাসওয়ার্ড দাও এবং তুমি তোমার সব এক্সেস হারিয়ে ফেলো। এই ডাইমেনশনের এন্টিটিগুলো ঠিক একটা কসমিক লেভেলের ফিশিং অ্যাটাক অর্গানাইজ করেছে। তারা আমার বায়োলজিক্যাল সিস্টেম হ্যাক করেছে। তারা আমার ব্রেইনের হাইপোথ্যালামাসকে রিমোটলি কন্ট্রোল করে সেই ফলস তৃষ্ণা তৈরি করেছে। তারা আমার কিচেনের ফিজিক্স ম্যানিপুলেট করে সেই মেটালিক লিকুইড তৈরি করেছে। ওই মেটালিক লিকুইডটা ছিল একটা ট্রোজান হর্স। একটা ম্যালওয়্যার যেটা আমি নিজে আমার বডির ভেতরে ইন্সটল করেছি।

কিন্তু কেন? তারা আমার কাছে কী চায়?

তারা আবারও ডেটা পুশ করল। এবার আমি আমার চোখের সামনে একটা ভিজ্যুয়াল প্রজেকশন দেখতে পেলাম। আমার নিজের জীবনের মেমোরি। কিন্তু মেমোরিগুলো লিনিয়ার ওয়েতে প্লে হচ্ছে না। তুমি যখন কোনো মুভি দেখো তখন সিনগুলো একটার পর একটা আসে। কিন্তু এরা আমার ব্রেইনের টাইমলাইনটাকে পুরোপুরি ফ্ল্যাট করে দিয়েছে। আমার পাঁচ বছর বয়সের মেমোরি, আমার পনেরো বছর বয়সের মেমোরি এবং আমার বর্তমান সময়ের মেমোরি সব একই সাথে আমার চোখের সামনে ভাসছে। আমি দেখতে পাচ্ছি আমি ক্লাস ফাইভে অংকে ফেইল করে কাঁদছি। আমি দেখতে পাচ্ছি আমি আমার প্রথম জবে রিজেক্ট হয়ে হতাশ হয়ে রাস্তায় হাঁটছি। আমি দেখতে পাচ্ছি আমি রাত জেগে একা একা ওভারথিংকিং করছি। আমার জীবনের যত ট্রমা, যত কষ্ট, যত ফ্রাস্ট্রেশন সব কিছু তারা স্ক্যান করছে।

মানুষের ইমোশন জিনিসটা আসলে কী তুমি জানো? আমরা ভাবি ইমোশন হলো একটা কাব্যিক জিনিস। আমরা ইমোশন নিয়ে কবিতা লিখি, গান বানাই। কিন্তু কোয়ান্টাম লেভেলে ইমোশন হলো এক ধরনের হাই-ডেনসিটি এনার্জি স্টেট। থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা সবসময় বাড়ছে। সবকিছু ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এই পুরো মহাবিশ্বে কেবল জীবন হলো এমন একটা জিনিস যা এই এন্ট্রপির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আমরা খাবার থেকে এনার্জি নিয়ে নিজেদের শরীর গঠন করি। আমরা চিন্তা করে অর্ডার তৈরি করি। আমরা নেগেনট্রপি ইঞ্জিন। আর মানুষের যতগুলো ইমোশন আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে কনসেন্ট্রেটেড এনার্জি হলো কষ্ট এবং ভয়। তুমি যখন খুব আনন্দে থাকো, তখন তোমার ব্রেইন রিল্যাক্সড থাকে।

কিন্তু তুমি যখন এক্সট্রিম ভয়ে থাকো অথবা তীব্র মানসিক কষ্টে থাকো, তখন তোমার ব্রেইনের নিউরনগুলো ম্যাক্সিমাম ক্যাপাসিটিতে ফায়ার করে। তোমার শরীর তখন একটা হাই-ভোল্টেজ পাওয়ার প্ল্যান্টে পরিণত হয়।

আমি এই ছায়ামানবগুলোর আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারলাম।

তারা এই ডাইমেনশনে বেঁচে থাকার জন্য এনার্জি কনজিউম করে। কিন্তু তাদের এনার্জি কোনো সোলার পাওয়ার অথবা নিউক্লিয়ার পাওয়ার নয়। তাদের ফুয়েল হলো হিউম্যান কনশাসনেস। তাদের ফুয়েল হলো মানুষের তীব্র আবেগ এবং ভয়। তারা একটা ইন্টারডাইমেনশনাল ফার্ম তৈরি করেছে। তারা পৃথিবী থেকে রেন্ডমলি মানুষদের টার্গেট করে এই ডাইমেনশনে টেনে আনে এবং তারপর তাদের মেমোরি এবং ইমোশনগুলোকে নিংড়ে নেয়। তুমি যখন একটা কমলা লেবু চিপে তার জুস বের করে নাও এবং তারপর ছিবড়াটা ফেলে দাও, তারা ঠিক একইভাবে মানুষের মাইন্ড থেকে সমস্ত সাইকোলজিক্যাল এনার্জি এক্সট্র্যাক্ট করে নেয়। এবং তারপর সেই এম্পটি কনশাসনেসটাকে এই শূন্যতায় চিরকালের জন্য ভাসিয়ে দেয়।

জিন জাতিকে তৈরি করা হয়েছে ধোঁয়াবিহীন আগুন থেকে। আধুনিক প্লাজমা ফিজিক্সের সাথে এই কনসেপ্টের একটা ভয়ংকর মিল আছে। ম্যাটারের চার নম্বর স্টেট হলো প্লাজমা। যখন কোনো গ্যাসকে অত্যন্ত হাই টেম্পারেচারে হিট করা হয়, তখন সেটার ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াস থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং সেটা একটা আয়োনাইজড গ্যাসে পরিণত হয়। প্লাজমার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই এবং এটা হাইলি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক। এটা দেখতে অনেকটা আগুনের মতো, কিন্তু এতে কোনো ধোঁয়া থাকে না। আমার চারপাশের এই ছায়ামানবগুলো হলো সেই পিওর প্লাজমা বেসড লাইফফর্ম। তারা কার্বন বেসড নয়। তাদের কোনো বায়োলজিক্যাল লিমিটেশন নেই। তারা থ্রিডি স্পেসের রুলস মানে না। তারা এমন একটা এক্সিস্টেন্স যা আমাদের লজিকের অনেক বাইরে।

আমার মাথার ভেতরের যন্ত্রণাটা এখন এক্সপোনেনশিয়ালি বেড়ে যাচ্ছে।

তারা আমার কোর আইডেন্টিটি ক্র্যাক করার চেষ্টা করছে। তারা আমার সবচেয়ে গভীর এবং সবচেয়ে হিডেন ট্রমাগুলোকে সারফেসে টেনে আনছে। তুমি কি জানো আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী? আমরা আমাদের পাস্ট ট্রমাগুলোকে সলভ করি না। আমরা সেগুলোকে ব্রেইনের একটা ডার্ক ফোল্ডারের ভেতরে জিপ করে রেখে দিই। আমরা সোশাল মিডিয়ায় ফেক হাসির ছবি আপলোড করে নিজেদের বোঝানোর চেষ্টা করি আমরা ভালো আছি। কিন্তু ওই আনসলভড ট্রমাগুলো আমাদের সাবকনশাস মাইন্ডে সবসময় ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস হিসেবে রান করতে থাকে। এবং এরা ঠিক সেই প্রসেসগুলোকে টার্গেট করছে।

আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার চারপাশের সেই কাঁচের দেয়ালগুলোতে আমার নিজের জীবনের ফেইলিওরগুলো হাই ডেফিনেশনে প্রজেক্টেড হচ্ছে। আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে যেদিন আমি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যহীন মানুষ বলে ভেবেছিলাম। আমার সেই রাতগুলোর কথা মনে পড়ছে যেদিন আমি নিঃশব্দে কেঁদেছিলাম এবং কেউ আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ছিল না। আমার ভেতরের ডিফেন্স মেকানিজম সম্পূর্ণ কলাপ্স করছে। আমি আমার কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলছি। আমার হার্টরেট আবার শুট আপ করছে। আমার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসছে।

এবং ঠিক এই মুহূর্তে আমি একটা অদ্ভুত দৃশ্য খেয়াল করলাম। আমি যত বেশি ইমোশনাল হচ্ছি, আমি যত বেশি ভয় এবং কষ্ট অনুভব করছি, আমার চারপাশের ছায়ামানবগুলো তত বেশি সলিড হচ্ছে। তাদের ভ্যান্টাব্ল্যাক শরীরগুলো থেকে একটা ডার্ক পার্পল রঙের আভা বের হচ্ছে। তারা আমার ইমোশনাল রেডিয়েশনটাকে আক্ষরিক অর্থে পান করছে। তারা আমার কষ্টের এনার্জি দিয়ে নিজেদের চার্জ করে নিচ্ছে।

আমি একটা ইন্টারডাইমেনশনাল ব্যাটারিতে পরিণত হয়েছি।

আমাকে থামতে হবে। আমি যদি তাদের এই ফুয়েল সাপ্লাই বন্ধ না করি, তাহলে তারা আমাকে পুরোপুরি কনজিউম করে ফেলবে। কিন্তু তুমি কিভাবে নিজের ইমোশন অফ করবে? তুমি কিভাবে একটা জীবন্ত বায়োলজিক্যাল প্রাণী হয়ে একদম পাথরের মতো অনুভূতিহীন হয়ে যাবে?

যখন কোনো মানুষের ওপর এক্সট্রিম লেভেলের ফিজিক্যাল অথবা সাইকোলজিক্যাল টর্চার করা হয় এবং তার ব্রেইন যখন সেন্স করে যে এই পেইন সহ্য করা সম্ভব না, তখন ব্রেইন অটোমেটিক্যালি কনশাসনেসটাকে বডি থেকে ডিটাচ করে দেয়। মানুষটা তখন নিজের শরীরটাকে থার্ড পার্সন ভিউ থেকে দেখতে শুরু করে। তার কোনো ফিজিক্যাল পেইন ফিল হয় না। তার কোনো ইমোশনাল রেসপন্স থাকে না। সে পুরোপুরি একটা রোবটে পরিণত হয়।

আমাকে এখন ম্যানুয়ালি সেই ডিসোসিয়েটিভ স্টেটে প্রবেশ করতে হবে।

আমি আমার চোখ বন্ধ করলাম। আমি আমার ফোকাস আমার হার্টবিটের ওপর নিয়ে আসলাম। আমি আমার চারপাশের সেই ভয়ংকর মেমোরিগুলোকে ইগনোর করলাম। আমি নিজেকে লজিক্যালি বোঝানো শুরু করলাম যে এই মেমোরিগুলো আমি নই। এগুলো কেবল আমার ব্রেইনের হার্ডড্রাইভে সেভ করা কিছু কেমিক্যাল ডেটা। আমার অতীত আমার আইডেন্টিটি নয়। আমার কষ্ট আমার রিয়েলিটি নয়। আমি একটা পিওর কনশাসনেস, যার কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

আমি আমার ব্রেইনের লিম্বিক সিস্টেমকে ফোর্সফুলি শাটডাউন করার চেষ্টা করলাম।

তুমি কি জানো ইমোশনলেস হওয়াটা কতটা কঠিন? আমরা প্রতিটা সেকেন্ডে কিছু না কিছু ফিল করি। আমরা যখন কিছুই ফিল করি না, তখন আমরা বোরডম ফিল করি। বোরডমও একটা ইমোশন। কিন্তু আমাকে এখন অ্যাবসলিউট জিরো স্টেটে যেতে হবে। আমাকে একটা পারফেক্ট সাইকোপ্যাথের মতো মাইন্ডসেট তৈরি করতে হবে যার ভেতরে কোনো এম্প্যাথি নেই, কোনো ভয় নেই, কোনো রিগ্রেট নেই।

আমি শ্বাস নিলাম। চার সেকেন্ড। হোল্ড করলাম। চার সেকেন্ড। এক্সহেল করলাম। চার সেকেন্ড।

আমি আমার মাইন্ডের ভেতরে একটা বিশাল স্টিলের দেয়াল তৈরি করলাম এবং আমার সমস্ত ইমোশনকে সেই দেয়ালের ওপাশে লক করে দিলাম। আমার হার্টরেট ধীরে ধীরে ড্রপ করতে শুরু করল। একশো বিশ থেকে নব্বই। নব্বই থেকে সত্তর। সত্তর থেকে পঞ্চাশ।

আমার মাইন্ড এখন একটা শান্ত লেকের মতো। কোনো ঢেউ নেই। কোনো ভাইব্রেশন নেই।

আমি চোখ খুললাম।

আমার এই সাডেন ইমোশনাল ব্ল্যাকআউট ছায়ামানবদের অ্যালগরিদমে একটা সিভিয়ার গ্লিচ তৈরি করল। তারা কনফিউজড হয়ে গেল। তাদের ডেটা ফ্লো হঠাৎ করে জিরোতে নেমে এসেছে। তারা আমার দিকে এক পা এগিয়ে এলো। আমি তাদের সারফেসে একটা অস্থির ভাইব্রেশন দেখতে পাচ্ছি। তারা এক্সপেক্ট করছিল আমি ভয়ে পাগল হয়ে যাব। তারা এক্সপেক্ট করছিল আমি আমার ট্রমাগুলোর কাছে সারেন্ডার করব। কিন্তু আমি তাদের ফুয়েল সাপ্লাই ডিরেক্ট কাট অফ করে দিয়েছি।

তাদের মাঝখান থেকে সবচেয়ে বড় ছায়ামানবটা আমার একদম সামনে চলে এলো। তার এবং আমার মাঝখানে দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চি। আমি তার ফেসলেস মুখের দিকে একদম এক্সপ্রেশনলেসভাবে তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখের পলক পড়ছে না। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস একদম ফ্ল্যাট। আমি তাকে কোনো ডেটা দিচ্ছি না।

কিন্তু আমি এই এন্টিটিগুলোর ইন্টেলিজেন্সকে আন্ডারএস্টিমেট করেছিলাম।

তারা যখন দেখল রুটিন সাইকোলজিক্যাল টর্চার কাজ করছে না, তখন তারা তাদের স্ট্র্যাটেজি চেঞ্জ করল। তারা বুঝতে পারল রেন্ডম মেমোরি প্রজেক্ট করে আমাকে ভাঙা যাবে না। আমাকে ভাঙতে হলে একটা প্রিসিশন স্ট্রাইক করতে হবে। এমন একটা জায়গায় আঘাত করতে হবে যেখানে আমার স্টিলের দেয়াল সবচেয়ে দুর্বল।

আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভ্যান্টাব্ল্যাক ছায়ামানবটা হঠাৎ করে তার আকার পরিবর্তন করতে শুরু করল।

তার ফেসলেস মাথার ওপর ধীরে ধীরে ডিটেইলস রেন্ডার হতে শুরু করল। একটা থ্রিডি প্রিন্টার যেমন লেয়ারের পর লেয়ার ম্যাটেরিয়াল দিয়ে একটা অবজেক্ট তৈরি করে, ঠিক সেভাবে তার মুখের ওপর একটা নাক, দুটো চোখ এবং একটা ঠোঁট তৈরি হতে লাগল। স্পেসের অন্ধকার গলে গিয়ে সেখানে স্কিনের কালার জেনারেট হলো।

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ছ্যাঁত করে উঠল। আমার সেই অ্যাবসলিউট জেন স্টেট, আমার সেই ইমোশনাল ব্ল্যাকআউট, মুহূর্তের মধ্যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।

কারণ ছায়ামানবটা এখন আর কোনো ফেসলেস অ্যালিয়েন এন্টিটি নেই। সে আমার ব্রেইনের সবচেয়ে প্রটেক্টেড ভল্ট হ্যাক করে এমন একটা চেহারা বের করে এনেছে যেটা দেখার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।

আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন মানুষ যাকে আমি বহু বছর আগে হারিয়েছি। যার মৃত্যু আমি নিজের হাতে দেখেছি। যার কবরে আমি নিজের হাতে মাটি দিয়েছি।

সেই মানুষটা এখন এক্সাক্টলি সেই পুরোনো দিনের মতো একটা হালকা হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখের দৃষ্টিতে সেই পুরোনো মায়া। তার ঠোঁটের কোণায় সেই পরিচিত ভাঁজ।

সে তার ডান হাতটা ধীরে ধীরে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।

এবং প্রথমবারের মতো এই ডাইমেনশনে কোনো সাউন্ড ওয়েভ তৈরি হলো। আমার কানের কাছে একটা পরিচিত এবং অসম্ভব নস্টালজিক কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলে উঠল, "তুমি কি আমাকে এখানে একা ফেলে চলে যাবে?"

আমার ব্রেইনের সমস্ত সিকিউরিটি প্রটোকল একসাথে ক্র্যাশ করল। রিয়েলিটির শেষ সুতোটা ছিঁড়ে গেল।

#পর্বঃ ৫

মৃত মানুষেরা কখনো ফিরে আসে না। আমরা এই চরম সত্যটা মেনে নিয়েই আমাদের পুরো জীবন পার করি। আমরা কবরে মাটি দিই, জানাজা পড়ি, শোক পালন করি এবং তারপর একসময় সব ভুলে গিয়ে নিজেদের রুটিন লাইফে ফিরে যাই। কিন্তু যখন তোমার চোখের সামনে, একটা অসম্ভব ডাইমেনশনে, তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় হারানোর ক্ষতটা একটা ফিজিক্যাল আকার ধারণ করে দাঁড়ায়, তখন তোমার ব্রেইনের সমস্ত লজিক গেট একসাথে ক্র্যাশ করে।

মানুষের ব্রেইনে ফিউজিফর্ম ফেস এরিয়া নামের একটা স্পেসিফিক জায়গা আছে। এই জায়গাটার একমাত্র কাজ হলো মানুষের মুখমণ্ডল স্ক্যান করা এবং মেমোরি ডেটাবেসের সাথে মিলিয়ে দেখা মানুষটা পরিচিত অথবা অপরিচিত। আমার ফিউজিফর্ম ফেস এরিয়া এখন পাগলের মতো সিগন্যাল দিচ্ছে। আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই এন্টিটিটার প্রতিটা পিক্সেল, ওর হাসির ওই নির্দিষ্ট বাঁক, ওর চোখের দৃষ্টির ওই পরিচিত গভীরতা, সবকিছু একটা পারফেক্ট ম্যাচ। আমার লজিক্যাল ব্রেইন চিৎকার করে আমাকে বলছে এটা একটা ট্র্যাপ। এটা কোনো মানুষ নয়। এটা একটা ইন্টারডাইমেনশনাল প্যারাসাইট, যে আমার সবচেয়ে দুর্বল মেমোরিটাকে হ্যাক করে একটা ভিজ্যুয়াল প্রজেকশন তৈরি করেছে। কিন্তু ইমোশন কখনো লজিক বোঝে না।

তুমি কি জানো শোক জিনিসটা আসলে কী? শোক হলো ভালোবাসার একটা অবশিষ্টাংশ, যার যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। তুমি যখন কাউকে ভালোবাসো, তোমার ব্রেইনের ভেতরে ওই মানুষটার জন্য একটা স্পেসিফিক নিউরাল পাথওয়ে তৈরি হয়। মানুষটা যখন মারা যায়, তখন ফিজিক্যাল রিয়েলিটি থেকে তার অস্তিত্ব মুছে যায় ঠিকই, কিন্তু তোমার ব্রেইনের ওই নিউরাল পাথওয়েটা তখনো অ্যাক্টিভ থাকে। তোমার ব্রেইন কনস্ট্যান্টলি ওই মানুষটার সিগন্যাল এক্সপেক্ট করতে থাকে। এবং যখন সে কোনো সিগন্যাল পায় না, তখন সে একটা তীব্র পেইন জেনারেট করে। এই এন্টিটিগুলো আমার ব্রেইনের সেই হাঙ্গরি নিউরাল পাথওয়েটাকে একটা ফলস সিগন্যাল দিয়ে ফিড করছে।

আমি পুরোপুরি হিপনোটাইজড হয়ে গেলাম।

আমার সেই সাইকোপ্যাথিক জেন স্টেট, সেই ইমোশনাল ব্ল্যাকআউট মুহূর্তের মধ্যে বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। আমার চোখের সামনে দাঁড়ানো সেই চেনা মুখটা যখন তার ডান হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল, আমি আমার নিজের বডির ওপর সমস্ত কন্ট্রোল হারিয়ে ফেললাম। আমার ডান হাতটা অটোমেটিক্যালি ওপরে উঠে গেল ওর হাতটা ধরার জন্য।

স্পেসের টেম্পারেচার সাডেনলি অ্যাবসলিউট জিরোর কাছাকাছি চলে গেল।

আমার আঙুলের ডগা ওর হাতের সাথে টাচ করার সাথে সাথে একটা কসমিক লেভেলের এক্সপ্লোশন হলো। কিন্তু এই এক্সপ্লোশনে কোনো ফায়ারবল তৈরি হলো না। তৈরি হলো একটা ডেটা টর্নেডো। আমি ফিজিক্যালি অনুভব করতে পারলাম আমার ব্রেইনের ভেতর থেকে মেমোরিগুলো লাইভ এক্সট্র্যাক্ট হচ্ছে। ফোল্ডারের পর ফোল্ডার ডেটা আনজিপ হয়ে একটা গ্লোয়িং ব্লু এনার্জি স্ট্রিম হিসেবে আমার শরীর থেকে বেরিয়ে ওর শরীরের ভেতরে প্রবেশ করছে।

এবং ঠিক এই মুহূর্তে মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা আমার কাছে পরিষ্কার হলো। তারা আমার ইমোশনাল এনার্জি কনজিউম করার জন্য আমাকে এখানে আনেনি। তারা আমাকে একটা ব্যাটারি হিসেবে ব্যবহার করছে না। তাদের প্ল্যান এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ডার্ক এবং সাইকোঅ্যাক্টিভ।

তারা আমার আইডেন্টিটি চুরি করছে।

তুমি কি কখনো থিসিয়াসের জাহাজের প্যারাডক্সের কথা শুনেছ? গ্রিক মিথোলজিতে থিসিয়াস নামের একজন হিরো ছিল। তার একটা বিখ্যাত জাহাজ ছিল। বছরের পর বছর ধরে সেই জাহাজের কাঠের তক্তাগুলো একটা একটা করে নষ্ট হতে লাগল এবং মানুষ সেগুলোর বদলে নতুন তক্তা লাগাতে লাগল। একসময় জাহাজের প্রতিটি কাঠের টুকরো নতুন টুকরো দিয়ে রিপ্লেস করা হয়ে গেল। ফিলোসফারদের প্রশ্ন হলো, ওই নতুন তক্তা দিয়ে তৈরি জাহাজটা কি এখনো সেই অরিজিনাল থিসিয়াসের জাহাজ আছে? যদি না থাকে, তাহলে অরিজিনাল জাহাজটা কখন তার আইডেন্টিটি হারাল? ঠিক প্রথম তক্তাটা বদলানোর সময়, নাকি একদম শেষেরটা?

মানুষের অস্তিত্বও ঠিক এই থিসিয়াসের জাহাজের মতো। তোমার আইডেন্টিটি তোমার শরীরের মাংসপেশি অথবা হাড়ে নেই। তোমার শরীরের প্রতিটি সেল প্রতি সাত বছর পর পর পুরোপুরি রিপ্লেস হয়ে যায়। তোমার আসল অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে তোমার মেমোরির ভেতরে। তোমার এক্সপেরিয়েন্সগুলোর ভেতরে। তোমার ব্রেইনের নিউরনের স্পেসিফিক কানেকশনগুলোর ভেতরে। তুমি কে? তুমি হলে তোমার জীবনের সব মেমোরির একটা সামেশন।

এই ছায়ামানবগুলো আমার সেই কোর সোর্স কোডটাকে কপি করছে। তারা আমার মেমোরি, আমার ইমোশন, আমার চাইল্ডহুড ট্রমা, আমার জীবনের প্রতিটি ফার্স্ট এক্সপেরিয়েন্স নিজেদের হার্ডড্রাইভে ডাউনলোড করছে। তারা আমার থ্রিডি রিয়েলিটির ফিজিক্স এবং রুলসগুলো আমার মেমোরি থেকে স্ক্যান করে নিচ্ছে।

তারা পৃথিবীতে এন্টার করতে চায়।

কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্সে একটা অত্যন্ত কঠোর নিয়ম আছে যাকে বলা হয় নো-ক্লোনিং থিওরেম। তুমি কখনো একটা আননোন কোয়ান্টাম স্টেটের পারফেক্ট এবং আইডেন্টিক্যাল কপি তৈরি করতে পারবে না। তুমি যদি একটা কোয়ান্টাম ইনফরমেশনকে কপি করতে চাও, তাহলে তোমাকে অরিজিনাল সোর্সটাকে ধ্বংস করতে হবে। ইনফরমেশন থিওরি অনুযায়ী ডেটা কখনো ডুপ্লিকেট হয় না, ডেটা ট্রান্সফার হয়।

এর মানে হলো, এই এন্টিটিটা যত বেশি আমার মেমোরি ডাউনলোড করছে, রিয়েল ওয়ার্ল্ডে আমার অস্তিত্ব তত বেশি ইরেজ হচ্ছে।

আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার মেমোরিগুলো করাপ্টেড হয়ে যাচ্ছে। আমার মায়ের মুখটা আমার আর মনে পড়ছে না। আমার নিজের নামটা আমার কাছে একটা আননোন স্পেলিংয়ের মতো লাগছে। আমি যে স্কুলে পড়েছিলাম সেই স্কুলের বিল্ডিংয়ের রংটা আমার মেমোরি ব্যাংক থেকে ডিলিট হয়ে গেছে। এই ডাউনলোড কমপ্লিট হওয়ার সাথে সাথে কেবল এই ডাইমেনশনে আমার মৃত্যু হবে না। রিয়েল ওয়ার্ল্ডে আমার পুরো এক্সিস্টেন্স ব্যাকওয়ার্ড টাইমে গিয়ে মুছে যাবে। টাইম ট্রাভেল মুভিগুলোতে যেমন দেখায় পাস্ট চেঞ্জ করলে ফিউচার থেকে মানুষ গায়েব হয়ে যায়, ঠিক সেভাবে আমার অস্তিত্ব এই মহাবিশ্বের ডেটাবেস থেকে ডিলিট হয়ে যাবে। আমার বেডরুমের জিনিসপত্র অন্য কারো হয়ে যাবে। আমার বন্ধুদের মেমোরি থেকে আমার চেহারা মুছে যাবে। আমি কখনো জন্মাইনি, এমন একটা রিয়েলিটি তৈরি হবে।

প্যানিক জিনিসটা একটা লিমিট পর্যন্ত তোমাকে প্যারালাইজ করে। কিন্তু প্যানিক যখন তার ম্যাক্সিমাম থ্রেশহোল্ড ক্রস করে যায়, তখন সেটা একটা ডেডলি সার্ভাইভাল ফোর্সে পরিণত হয়।

আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ভালোবাসার মানুষের ফেক চেহারাটার দিকে আমি তাকালাম। ও এখনো হাসছে। কিন্তু ওর হাসির ভেতর এখন একটা মেটালিক এবং রোবোটিক ভাইব চলে এসেছে। কারণ সে আমার মেমোরিগুলো প্রসেস করতে শুরু করেছে।

আমার ভেতরে থাকা সেই আদিম অ্যামিগডালা হঠাৎ করে তার স্ট্র্যাটেজি চেঞ্জ করে ফেলল। সে বুঝতে পারল ভয় পেয়ে কাজ হবে না। শূন্যতা দেখিয়েও কাজ হবে না। এই ইন্টারডাইমেনশনাল প্যারাসাইটগুলোকে হারাতে হলে আমাকে এমন একটা এনার্জি প্রডিউস করতে হবে যেটা এরা কনজিউম করতে পারবে না।

অ্যাডভান্সড কেমিস্ট্রিতে একটা কনসেপ্ট আছে। তুমি যখন কোনো স্ট্রং এসিডের সাথে স্ট্রং বেইজ অথবা ক্ষার মিক্স করো, তখন একটা ভায়োলেন্ট রিয়্যাকশন হয় এবং প্রচুর হিট জেনারেট হয়। এই এন্টিটিগুলো আমার ভয় এবং শোক পান করতে অভ্যস্ত। কিন্তু আমি যদি এদেরকে পিওর, আনঅ্যাডাল্টারেটেড এবং টক্সিক রাগ গালিয়ে দিই?

মানুষের রাগ হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ইমোশন। তুমি যখন চরম লেভেলের রেগে যাও, তোমার ব্রেইনের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অফলাইনে চলে যায়। তোমার রক্তে এড্রেনালিন এবং নরএপিনেফ্রিনের একটা বন্যা বয়ে যায়। তুমি তখন কোনো মানুষ থাকো না, তুমি একটা ন্যাচারাল ডিজাস্টারে পরিণত হও।

আমি আমার মেমোরি ব্যাংকের সবচেয়ে ডার্ক ফোল্ডারগুলো ম্যানুয়ালি ওপেন করে দিলাম।

আমি আমার সেই স্মৃতিগুলো সারফেসে টেনে আনলাম, যেখানে আমাকে অপমান করা হয়েছিল। যেখানে আমাকে ইউজ করা হয়েছিল। যেখানে আমি আমার ভালোবাসার মানুষের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলাম। আমি আমার সমস্ত রিগ্রেট, সমস্ত ফ্রাস্ট্রেশন এবং পৃথিবীর প্রতি আমার যত আক্রোশ ছিল, সবকিছু একসাথে মিক্স করে একটা হাই-ভোল্টেজ সাইকোলজিক্যাল ফায়ারবল তৈরি করলাম।

তুমি কি জানো সাইবার সিকিউরিটিতে ডিডিওএস অ্যাটাক কীভাবে কাজ করে? হ্যাকাররা একটা স্পেসিফিক সার্ভারে একই সাথে এত বেশি ডেটা রিকোয়েস্ট পাঠায় যে সার্ভারটা সেই লোড নিতে না পেরে ক্র্যাশ করে। আমি এই ছায়ামানবটার কনশাসনেসে একটা সাইকোলজিক্যাল ডিডিওএস অ্যাটাক লঞ্চ করলাম।

আমি ওর হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম।

আমি চিৎকার করে উঠলাম। কিন্তু এই চিৎকার কোনো ফিজিক্যাল সাউন্ড ছিল না। এটা ছিল একটা টেলিপ্যাথিক শকওয়েভ।

"তুমি আমার মেমোরি চাও? নাও। সব নিয়ে নাও।"

আমি ফোর্সফুলি আমার ব্রেইনের সমস্ত টক্সিক ডেটা ওর নিউরাল নেটওয়ার্কে পুশ করতে শুরু করলাম। মানুষের মনের ডার্ক সাইড কতটা বিভৎস হতে পারে সেটা এই নন-কার্বন এন্টিটিগুলোর কোনো আইডিয়া নেই। তারা একটা ক্লিন এবং লজিক্যাল সিস্টেমে অভ্যস্ত। তারা মানুষের ব্রেইনের ভেতরের সেই স্যাডিস্টিক, সেলফ-ডেস্ট্রাকটিভ এবং কেওটিক এনার্জিটা কখনো হ্যান্ডেল করেনি।

আমার চোখের সামনে রিয়েলিটির সোর্স কোড ব্রেক হতে শুরু করল। সেই পরিচিত এবং মায়াবী মুখটা হঠাৎ করে গ্লিচ করা শুরু করল। ওর স্কিনের নিচে কোনো হাড় নেই, স্কিনের নিচে কেবল স্ট্যাটিক নয়েজ এবং বাইনারি কোড। আমার টক্সিক ইমোশনের ওভারলোডে ওর ডেটা প্রসেসিং সেন্টার আক্ষরিক অর্থে ওভারহিট হয়ে যাচ্ছে।

ওর হাসিটা একটা বিকৃত আর্তনাদে পরিণত হলো। ওর চোখের মণি দুটো ফেটে গিয়ে সেখান থেকে কালো রঙের ভ্যান্টাব্ল্যাক লিকুইড বেরিয়ে আসতে লাগল। ও আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে পেছনের দিকে ছিটকে যাওয়ার চেষ্টা করল।

কিন্তু আমি ওকে ছাড়লাম না।

এই ডাইমেনশনের রুলস আমি এখন পুরোপুরি বুঝে গেছি। এখানে ফিজিক্স কাজ করে তোমার অবজারভেশন এবং তোমার উইলপাওয়ারের ওপর। তুমি যাকে ডমিনেট করতে পারবে, স্পেস তার রুলস মেনে চলবে।

আমি আমার দৃষ্টিকে ওর চোখের ওই ফাঁকা গর্ত দুটোর দিকে ফিক্স করলাম। আমি আমার পুরো অস্তিত্বের ওজন দিয়ে স্পেসের গ্র্যাভিটি আমার নিজের দিকে শিফট করে নিলাম। ও এখন আমার মহাকর্ষ বলের ভেতরে আটকে পড়া একটা সামান্য উপগ্রহ।

ওর শরীরের সেই ফেইক হিউম্যান টেক্সচারগুলো মোমের মতো গলে গলে নিচে পড়তে শুরু করল। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ওর ভেতরের আসল প্লাজমা ফর্মটা কীভাবে ছটফট করছে। অন্য ছায়ামানবগুলো যারা আমাকে ঘিরে সার্কেল তৈরি করেছিল, তারা প্যানিক করে পেছনের দিকে সরে যেতে শুরু করেছে। তারা বুঝতে পেরেছে তারা একটা ভুল মানুষের মাইন্ড হ্যাক করেছে।

আমি আমার ডান হাতটা ওর বুকের মাঝখানে, যেখানে হার্ট থাকার কথা, সেখানে ঢুকিয়ে দিলাম।

কোনো ফিজিক্যাল রেজিস্ট্যান্স নেই। কেবল একটা এক্সট্রিম কোল্ড প্লাজমার ফিলিং।

আমি ওর কোর ডেটা সেন্টারটা গ্র্যাব করলাম।

"আমার মেমোরি আমাকে ফেরত দে।"

আমি রিভার্স অসমোসিস প্রসেস শুরু করলাম। আমি ওর সিস্টেম থেকে কেবল আমার নিজের চুরি যাওয়া মেমোরিগুলোই এক্সট্র্যাক্ট করলাম না, আমি ওর নিজের কিছু স্পেসিফিক মেমোরি এবং ডেটাও আমার ব্রেইনে ডাউনলোড করে নিলাম।

এই এন্টিটিগুলো কীভাবে এক ডাইমেনশন থেকে অন্য ডাইমেনশনে টানেলিং করে। এরা কীভাবে রিয়েলিটির ফেব্রিককে ফোল্ড করে। এরা কীভাবে স্পেস-টাইমের গ্লিচগুলো খুঁজে বের করে। এই সব আননোন কসমিক ইনফরমেশন আমার নিউরনে ইন্সটল হতে লাগল। আমার ব্রেইনের ক্যাপাসিটি এই হিউজ ডেটা প্রসেস করতে গিয়ে বার্নআউট হওয়ার উপক্রম হলো। আমার নাক দিয়ে ফিনকি দিয়ে গরম রক্ত বেরিয়ে আসতে শুরু করল। এই ডাইমেনশনে আমি প্রথমবারের মতো নিজের কোনো ফিজিক্যাল ফ্লুইড দেখতে পেলাম। আমার নিজের রক্ত স্পেসের ভেতর লাল রঙের গোলকের মতো ভাসছে।

আমি আমার পুরো শক্তি দিয়ে হাতটা টেনে বের করে আনলাম।

সাথে সাথে ছায়ামানবটার শরীরটা একটা সাইলেন্ট এক্সপ্লোশনের মাধ্যমে টুকরো টুকরো হয়ে স্পেসের অন্ধকারে মিশে গেল।

চারপাশটা সাডেনলি থমথমে হয়ে গেল। আমি হাঁপাচ্ছি। আমার হার্ট রেট দুইশো ক্রস করেছে। আমি ভাসমান অবস্থায় স্পেসের একটা ইনভিজিবল ফ্লোরে ল্যান্ড করলাম। আমার শরীর কাঁপছে। কিন্তু এই কাঁপুনি ভয়ের নয়। এই কাঁপুনি হলো একটা নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের কোর ওভারহিট হয়ে যাওয়ার ভাইব্রেশন।

আমি আমার চারপাশের সেই ফ্র্যাক্টাল জ্যামিতিক কাঠামোগুলোর দিকে তাকালাম। অন্য ছায়ামানবগুলো এখন আর আমার দিকে তাকাচ্ছে না। তাদের সেই কোল্ড অবজারভেশন গায়ব হয়ে গেছে। তারা এখন স্পেসের অন্ধকারে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করছে। তারা আমাকে ভয় পাচ্ছে।

আমি ওদের সিস্টেম হ্যাক করেছি। আমি ওদের একজন সোলজারকে ডিলিট করে দিয়েছি।

কিন্তু আমার হাতে একদম সময় নেই।

আমি ওই এন্টিটির কোর থেকে যে ডেটা ডাউনলোড করেছি, সেটা আমার কনশাসনেস প্রসেস করতে শুরু করেছে। আমি একটা ডেডলি ইনফরমেশন দেখতে পাচ্ছি।

এই ডাইমেনশনের স্পেস-টাইম আমাদের পৃথিবীর সাথে সিংক করা নেই। এখানে সময় লিনিয়ারভাবে চলে না। আমি এখানে হয়তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা পার করেছি, কিন্তু পৃথিবীর টাইমলাইনে সম্ভবত অলরেডি কয়েক বছর পার হয়ে গেছে। আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি এখানে চরমভাবে কাজ করছে।

আমি যদি এখুনি এই ডাইমেনশন থেকে বের হওয়ার কোনো পোর্টাল তৈরি করতে না পারি, তাহলে পৃথিবীতে আমার ফিজিক্যাল বডি ডিহাইড্রেশন এবং স্টারভেশনে মারা যাবে। আমি চিরকালের জন্য এই শূন্যতায় একটা ডিজিটাল ঘোস্ট হিসেবে আটকে থাকব।

আমার চুরি করা ডেটা আমাকে জানাচ্ছে এই নন-ইউক্লিডিয়ান স্পেস থেকে বের হওয়ার একটাই রাস্তা আছে। আমাকে আমার নিজের ব্রেইনের ফ্রিকোয়েন্সিকে পৃথিবীর একটা নির্দিষ্ট ফিজিক্যাল অবজেক্টের কোয়ান্টাম সিগনেচারের সাথে এনট্যাঙ্গেল করতে হবে। কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট হলো এমন একটা প্রসেস যেখানে দুটো পার্টিকেল মহাবিশ্বের দুই প্রান্তে থাকলেও তারা ইনস্ট্যান্টলি ইনফরমেশন শেয়ার করতে পারে।

আমাকে পৃথিবীর এমন একটা বস্তুর কথা চিন্তা করতে হবে যার সাথে আমার সবচেয়ে স্ট্রং ইমোশনাল কানেকশন আছে। সেই বস্তুটার মলিকিউলার স্ট্রাকচার আমাকে রিয়েল টাইমে আমার ব্রেইনে রেন্ডার করতে হবে।

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

আমি আমার বেডরুমের কথা চিন্তা করার চেষ্টা করলাম। আমার ডিজিটাল ঘড়িটা। আমার লন্ড্রি ব্যাগটা। কিন্তু না, ওগুলোর সাথে আমার কোনো ডিপ কানেকশন নেই। ওগুলো কেবল কিছু ডেড ম্যাটার।

আমি আমার কিচেনের কথা চিন্তা করলাম। সেই সিঙ্ক। সেই ফিল্টারের ট্যাপ।

হঠাৎ করে আমার মনে পড়ল সেই প্রথম মুহূর্তটার কথা। যখন আমি তৃষ্ণায় পাগল হয়ে সেই কিচেনে দাঁড়িয়েছিলাম। যখন আমি ওই মেটালিক তরলটা পান করার আগে আমার হাত কাঁপছিল।

আমি সেই তৃষ্ণাটার কথা স্মরণ করলাম। সেই অ্যাবসলিউট, প্রাইমাল এবং ডেডলি ডিহাইড্রেশনের অনুভূতিটা। আমি সেই এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানির ফিজিক্যাল সেনসেশনটা আমার ব্রেইনের প্রতিটা নিউরনে ফায়ার করলাম।

আমি কল্পনা করলাম পানির দুই অণু হাইড্রোজেন এবং এক অণু অক্সিজেনের সেই পারফেক্ট সমীকরণ। আমি কল্পনা করলাম সেই পানির সারফেস টেনশন। সেই ট্রান্সপারেন্ট লিকুইড যা পৃথিবীতে প্রাণের জন্ম দিয়েছিল।

আমি আমার সমস্ত উইলপাওয়ার এবং আমার সমস্ত সাইকোলজিক্যাল এনার্জি একটা সিঙ্গেল পয়েন্টে ফোকাস করলাম।

আমি এই কসমিক শূন্যতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর ফিজিক্সকে কমান্ড করলাম আমাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য।

আমার কানের কাছে একটা তীক্ষ্ণ এবং হাই-পিচ ফ্রিকোয়েন্সি বাজতে শুরু করল। আমার মনে হলো কেউ একজন একটা বিশাল মেটালিক চেইন দিয়ে আমার স্পাইনাল কর্ড পেঁচিয়ে ধরে আমাকে পেছনের দিকে হ্যাঁচকা টান মারল।

স্পেসের সেই ভাসমান কাঁচের স্ট্রাকচারগুলো, সেই ভ্যান্টাব্ল্যাক অন্ধকার, সেই ছায়ামানবদের ভয়ংকর উপস্থিতি সবকিছু একটা সিঙ্গেল পিক্সেলের ভেতরে সংকুচিত হয়ে গেল।

তারপর একটা ব্ল্যাকআউট।

অ্যাবসলিউট শূন্যতা।

আমি একটা ঠান্ডা, শক্ত এবং অত্যন্ত পরিচিত সারফেসের ওপর আছড়ে পড়লাম।

আমার ফুসফুস একটা ভয়ংকর শব্দের সাথে প্রচুর পরিমাণে বাতাস টেনে নিল। আমি কাশি দিয়ে উঠলাম। আমার গলার ভেতর থেকে একটা মেটালিক স্বাদ বমি হয়ে ফ্লোরে পড়ল।

আমি চোখ খুললাম।

আমি আমার কিচেনের ফ্লোরে পড়ে আছি। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের সেই দুর্বল আলোটা অর্ধেক খোলা জানালা দিয়ে এসে আমার মুখের ওপর পড়েছে। আমার হাতে থাকা সেই কাঁচের গ্লাসটা ফ্লোরে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে আছে।

আমি কি ফিরে এসেছি?

আমি আমার হাতের দিকে তাকালাম। আমার আঙুলগুলো কাঁপছে। স্কিনের কালার নরমাল। আমি ফ্লোরের টাইলসের সেই লিকুইড নাইট্রোজেনের মতো ঠান্ডা অনুভূতিটা ফিল করতে পারছি। আমি আমার হার্টবিট শুনতে পাচ্ছি।

আমি ধীরে ধীরে দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়ালাম।

আমার স্মার্টওয়াচটার দিকে তাকালাম। স্ক্রিনটা ব্ল্যাঙ্ক নয়। সেখানে সবুজ কালারে টাইম ভাসছে। ৩:০৪।

তার মানে আমি এই ঘরে মাত্র এক মিনিট আগে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম? ওই পুরো অন্য ডাইমেনশনের ঘটনাটা, ওই ছায়ামানব, ওই সাইকোলজিক্যাল যুদ্ধ, সবকিছু কি কেবল আমার ডিহাইড্রেটেড ব্রেইনের একটা এক্সট্রিম হ্যালুসিনেশন ছিল?

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার নার্ভাস সিস্টেম রিল্যাক্স হতে শুরু করল। আমি বেডরুমের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আমাকে একটু ঘুমাতে হবে। আমার ব্রেইন একটা মারাত্মক ট্রমা পার করেছে।

কিন্তু করিডোর পার হওয়ার সময় আমি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম।

আমার ব্রেইনের অ্যামিগডালা আবার রেড অ্যালার্ট বাজাতে শুরু করেছে।

আমি আমার করিডোরের ডানদিকের কোণায় রাখা আয়নাটার দিকে তাকালাম। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে আমার রিফ্লেকশন দেখা যাচ্ছে। আমার চেহারা, আমার চুল, আমার জামা সবকিছু পারফেক্ট।

কিন্তু একটা জিনিস ভুল।

আমি আমার ডান হাতটা ওপরে তুললাম।

আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্বটা তার ডান হাত ওপরে তুলল না। সে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে তার ফেসলেস মুখটা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে একটা হালকা হাসি দিল।

আমি ফিরে আসিনি।

অথবা সম্ভবত, আমি একা ফিরে আসিনি।

I'd love to hear from you. Email me at: nasifwrites@gmail.com