Back to Library
Singularity - Read Free Science Fiction and Thriller Book Cover
0

Singularity

By Nasif Muhammad

মাঝরাতে টেবিলে বসে লেখা একটি সাধারণ গল্প যদি হঠাৎ আপনার নিজের বাস্তবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে? এই সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারটি মানব মন ও মহাজাগতিক রহস্যের এক শ্বাসরুদ্ধকর এক্সপেরিমেন্ট। টাইম ডিলেশন, কোয়ান্টাম মেকানিক্স আর সিমুলেশন থিওরির এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় লেখকের কলম আর মহাবিশ্বের সোর্স কোড এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আপনার চারপাশের পৃথিবীটা কি আসলেই সত্যি? নাকি আপনার স্মৃতি, আবেগ এবং স্বাধীন ইচ্ছা, সবই কোনো উচ্চতর শক্তির নিখুঁত প্রোগ্রামিং? প্রতিটি ধাপের রিয়েলিটি গ্লিচ আর অজানা সমীকরণ আপনাকে বাধ্য করবে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে। গল্পের চরিত্র আর পাঠকের মাঝখানের অদৃশ্য দেয়াল যখন ভেঙে পড়বে, তখন কি আপনি আসল সত্যটা মেনে নিতে পারবেন? অস্তিত্বের সবচেয়ে ভয়ংকর রহস্য উন্মোচন করতে আজই ডুব দিন এই টাইম-বেন্ডিং থ্রিলারে।

Singularityসিঙ্গুলারিটিNasif Muhammadনাসিফ মুহাম্মাদBangla Science Fiction

Chapters

18

#পর্বঃ ১

টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলোটা কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে আছে। আমার সামনে খোলা খাতা, হাতে সস্তা বলপয়েন্ট কলম।

একটা অদ্ভুত তথ্য দিয়ে শুরু করি। আপনারা কি জানেন, পুরোনো বইয়ের পাতার যে অদ্ভুত সুন্দর গন্ধটা পাওয়া যায়, সেটা আসলে বইয়ের মৃত্যুর গন্ধ? কাগজ তৈরি হয় কাঠ থেকে, আর সেই কাঠে থাকে 'লিগনিন' নামের এক ধরনের পলিমার। বছরের পর বছর ধরে এই লিগনিন যখন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে ভেঙে যেতে থাকে, তখন ভ্যানিলিন নামের এক ধরনের রাসায়নিক নির্গত হয়। ভ্যানিলা আইসক্রিমে আমরা যে ঘ্রাণ পাই, ঠিক সেটাই। অর্থাৎ, একটা বই যত বেশি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, তার গায়ের গন্ধ তত বেশি মিষ্টি হতে থাকে। মানুষের জীবনটাও কি অনেকটা সেরকম নয়? বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ অভিজ্ঞতার ভারে নুয়ে পড়ে, কিন্তু তার গল্পের গভীরতা বাড়ে।

আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, মানুষ আসলে কিছুই জানে না। আমরা যা জানি বলে দাবি করি, সেটা আসলে মহাবিশ্বের অসীম অজ্ঞতার সমুদ্রে এক ফোঁটা জল।

একটা মজার ব্যাপার খেয়াল করেছেন? আমরা যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাই, আমরা আসলে অতীত দেখি। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় নেয় ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড। অর্থাৎ, এই মুহূর্তে সূর্যটা যদি হুট করে নিভে যায়, আমরা সেটা জানতে পারব ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড পর। তার মানে, আমরা বর্তমানে বাস করলেও আমাদের চোখ সবসময় আটকে থাকে অতীতে। প্রক্সিমা সেন্টাওরি নক্ষত্রটা এখন যেখানে দেখছেন, ওটা আসলে ৪ বছর আগের ছবি। রিয়েল টাইমে মহাবিশ্বকে দেখার কোনো উপায় আমাদের নেই। আমরা সবাই আসলে টাইম ট্রাভেল করছি, তবে পেছনের দিকে।

আমার এই লেখাটা কোনো সাধারণ গল্প নয়। এটা একটা এক্সপেরিমেন্ট। হিউম্যান সাইকোলজি আর কসমিক রিয়েলিটির একটা জগাখিচুড়ি।

কিছুদিন আগে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। আমার ঘরের জানালার কার্নিশে একটা চড়ুই পাখি বসে আছে। খুব সাধারণ দৃশ্য, তাই না? কিন্তু পাখিটা নড়ছিল না। একদম স্ট্যাচু হয়ে বসে ছিল। আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। চোখের পলক ফেলছিলাম না। হঠাৎ মনে হলো, সময় থমকে গেছে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে 'টাইম ডিলেশন'। মহাকর্ষ বল যেখানে খুব বেশি, সেখানে সময় ধীর হয়ে যায়। আমার ছোট ঘরটায় কি হঠাৎ ব্ল্যাকহোলের জন্ম হলো? তা না হলে পাখিটা নড়ছে না কেন?

বিজ্ঞান বলে, আমাদের মস্তিষ্ক প্রতি সেকেন্ডে ১১ মিলিয়ন বিট ইনফরমেশন রিসিভ করে। কিন্তু প্রসেস করতে পারে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ বিট। বাকি সব ইনফরমেশন আমাদের ব্রেইন ফিল্টার করে ফেলে দেয়। ভাবুন তো একবার! এই যে আপনি লেখাটা পড়ছেন, আপনার চারপাশে এখন হাজার হাজার ঘটনা ঘটছে যা আপনি টেরই পাচ্ছেন না। বাতাসের কম্পন, ধূলিকণার ওড়াউড়ি, হয়তো আপনার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে থাকা কোনো ছায়া, আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে এসব দেখতে দিচ্ছে না কারণ সে আপনাকে পাগল হওয়া থেকে বাঁচাতে চায়। একে বলে 'কগনিটিভ ফিল্টারিং'।

আমি কি তাহলে সেই ফিল্টারটা সরিয়ে ফেলেছি? এখন তো আমি সব দেখতে পাচ্ছি।

পাখিটা শেষমেশ উড়ে গেল। কিন্তু যাওয়ার আগে আমার দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত কাজ করল। সে মাথাটা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে নিল। চড়ুই পাখি কি এটা করতে পারে? বায়োলজি বলে, পারে না। পেঁচা পারে। তাহলে কি আমি ভুল দেখলাম? নাকি এই মহাবিশ্বের কোডিংয়ে কোথাও কোনো 'গ্লিচ' হয়ে গেছে? ম্যাট্রিক্স সিনেমার মতো?

আমরা মনে করি বাস্তবতা ফিক্সড। যা দেখছি তাই সত্য। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলে, কোনো পর্যবেক্ষক না থাকলে বাস্তবতার কোনো অস্তিত্বই নেই। আপনি যখন চাঁদের দিকে তাকান না, তখন কি চাঁদটা আসলেও সেখানে থাকে? নাকি ওটা কেবল শক্তির একটা তরঙ্গ হিসেবে ভেসে বেড়ায়? যেই আপনি তাকালেন, অমনি সেটা পার্টিকেল হয়ে 'চাঁদ' এর রূপ নিল। ব্যাপারটা ভৌতিক শোনাচ্ছে, তাই না? কিন্তু এটাই বিজ্ঞান। আইনস্টাইন নিজেও এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, "আমি বিশ্বাস করতে চাই না যে আমি তাকালেই কেবল চাঁদটা সেখানে থাকে।"

আমার এই গল্পটা সেই না দেখা চাঁদের গল্প।

লেখার মাঝখানে একটু চা খাওয়া দরকার। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আরেকটা তথ্য মাথায় এল। আমরা যে পানি খাই, সেটা এই পৃথিবীর নয়। পৃথিবীর জন্মের সময় এখানে এত পানি ছিল না। কোটি কোটি বছর আগে বরফভর্তি ধুমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। সেই ধুমকেতুর বরফ গলা জলই আজকের মহাসাগর, নদী, আর আমার এই চায়ের কাপের লিকুইড। ভাবলে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় না? আমি এখন যে চা খাচ্ছি, সেটা আসলে এলিয়েন জুস! মহাকাশের অন্য কোনো কোণা থেকে আসা জল। আমরা সবাই আসলে মহাজাগতিক আবর্জনা দিয়ে তৈরি। আমাদের হাড়ের ক্যালসিয়াম, রক্তের আয়রন, সব তৈরি হয়েছে কোনো না কোনো মৃত নক্ষত্রের পেটে। নক্ষত্র বিস্ফোরিত না হলে কার্বন তৈরি হতো না, আর কার্বন না থাকলে আমি-আপনি কেউ থাকতাম না। আমরা আক্ষরিক অর্থেই তারার সন্তান। স্টারডাস্ট।

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা কি আসলেও স্বাধীন? নাকি আমাদের ডিএনএ নামের ওই সূক্ষ্ম সুতো দিয়ে কেউ আমাদের পুতুলের মতো নাচাচ্ছে? রিচার্ড ডকিন্স তাঁর 'দ্য সেলফিশ জিন' বইয়ে বলেছিলেন, আমরা হলাম আমাদের জিনের বেঁচে থাকার সার্ভাইভাল মেশিন। আমাদের রাগ, ভালোবাসা, কান্না, সবই জিনের কারসাজি যাতে সে নিজেকে কপি করে পরবর্তী প্রজন্মে পাঠিয়ে দিতে পারে। প্রেম কোনো স্বর্গীয় ব্যাপার নয়, ওটা কেবল জিনের রিপ্রোডাকশনের ফন্দি। কথাটা নিষ্ঠুর শোনাতে পারে, কিন্তু সত্য সবসময় সুন্দর হয় না। সত্য মাঝেমধ্যে বেশ কদাকার।

হঠাৎ লোডশেডিং হলো। চারপাশ অন্ধকার। ঢাকার এই এক সমস্যা, হুটহাট বিদ্যুৎ চলে যায়। অন্ধকারের একটা নিজস্ব ওজন আছে। মনে হচ্ছে অন্ধকারটা আমাকে চেপে ধরছে। অন্ধকারে মানুষের সেন্সগুলো শার্প হয়ে যায়। আমি শুনতে পাচ্ছি দেয়ালের ওপাশে টিকটিকির পায়ের শব্দ। শুনলে অবাক হবেন, টিকটিকির পায়ের পাতায় ভ্যান ডার ওয়ালস ফোর্স কাজ করে, তাই ওরা গ্রাভিটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সিলিংয়ে হাঁটতে পারে।

এই অন্ধকারে বসে আমার মনে হচ্ছে, আমি একা নই।

আপনার কি কখনো এমন হয়েছে যে, ঘরে কেউ নেই, কিন্তু আপনি স্পষ্ট অনুভব করছেন কেউ একজন আপনার দিকে তাকিয়ে আছে? এটাকে প্যারা সাইকোলজিতে বলে 'স্কোপাসস্থেশিয়া' (Scopaesthesia)। বিজ্ঞানের ভাষায় এর কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু বিবর্তনের ইতিহাসে এর ব্যাখ্যা আছে। আদিম যুগে যারা অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা বাঘ-সিংহের দৃষ্টি বুঝতে পারত না, তারা মারা যেত। আর যারা বুঝতে পারত, তারা বেঁচে যেত। আমরা সেই বেঁচে যাওয়া সতর্ক মানুষের বংশধর। তাই আজও অকারণে আমাদের মনে হয়, কেউ দেখছে।

কিন্তু এখন আমার মনে হওয়াটা কি ভুল? আমার ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা নিঃশ্বাস অনুভব করছি। খুব ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরালাম।

কিছুই নেই। কেবল একটা শূন্য চেয়ার। কিন্তু চেয়ারটা কি একটু নড়ে উঠল?

আমাদের মস্তিষ্ক প্যাটার্ন খুঁজতে পছন্দ করে। সে র‍্যান্ডম জিনিসের মধ্যে অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। একে বলে 'প্যারাডোলিয়া'। মেঘের মধ্যে মানুষের মুখ দেখা, বা চাঁদের গায়ে বুড়ির চরকা কাটা, সবই ব্রেইনের কারসাজি। আমার ব্রেইন কি এখন আমার সাথে গেম খেলছে?

আমি আবার লিখতে শুরু করলাম। কলমের কালি ফুরিয়ে আসছে। আচ্ছা, কালির এই নীল রংটা আসলে কী? আলো যখন কোনো বস্তুর ওপর পড়ে, তখন বস্তুটি কিছু রং শুষে নেয় আর কিছু রিফ্লেক্ট করে। যে রংটা রিফ্লেক্ট করে আমাদের চোখে আসে, আমরা বস্তুটাকে সেই রঙের দেখি। অর্থাৎ, কলমের কালিটা আসলে নীল ছাড়া বাকি সব রঙের। ওটা নীল রংটা রিফ্লেক্ট করছে বলেই আমরা নীল দেখছি। তার মানে, পৃথিবীতে আমরা যা দেখি, সেটা আসলে তা নয়। আমরা যা দেখি না, বস্তুটি আসলে তাই। ব্যাপারটা কি গোলমেলে লাগছে?

মহাবিশ্বটাই একটা গোলকধাঁধা।

আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করি। আপনি কি জানেন আপনার শরীরের কোষগুলোর বয়স কত? আপনি বলবেন আপনার বয়সের সমান? ভুল। আপনার চামড়ার কোষ প্রতি ২-৪ সপ্তাহে নতুন করে জন্মায়। লোহিত রক্তকণিকা বাঁচে মাত্র ৪ মাস। অর্থাৎ, কয়েক বছর পর পর আপনি পুরোপুরি নতুন মানুষ হয়ে যান। আপনার শরীরের একটা পরমাণুও আগের জায়গায় থাকে না। তাহলে 'আপনি' আসলে কে? ৫ বছর আগের আপনি আর এখনকার আপনির মধ্যে ফিজিক্যালি কোনো মিল নেই। মিল আছে কেবল স্মৃতিতে। স্মৃতিই আমাদের আইডেন্টিটি। আর সেই স্মৃতিও কতটা বিশ্বস্ত? প্রতিবার যখন আমরা কোনো পুরনো স্মৃতি মনে করি, আমাদের ব্রেইন সেটাকে এডিট করে। নতুন করে সেভ করে। অর্থাৎ, আপনার ছোটবেলার যে স্মৃতিটা আপনার কাছে খুব স্পষ্ট মনে হয়, সেটা আসলে অরিজিনাল ঘটনার ধারেকাছেও নেই। ওটা একটা ফটোকপির ফটোকপির ফটোকপি। ঝাপসা এবং বিকৃত।

লিখতে লিখতে আমার হাত ব্যথা করছে। কিন্তু থামার উপায় নেই। একটা অদৃশ্য শক্তি আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে। এই যে আপনি পড়ছেন, আপনার কি মনে হচ্ছে না লেখাটা আপনার সাথেই কথা বলছে?

আসলে প্রতিটি বই হলো লেখকের মনের সাথে পাঠকের মনের টেলিপ্যাথি। আমি এই মুহূর্তে কোথায় আছি, কী করছি, তা আপনার জানার কথা নয়। আমি হয়তো এখন বেঁচেও নেই। এই লেখা যখন আপনি পড়ছেন, ততক্ষণে আমি হয়তো নাইট্রোজেন আর কার্বনের স্তূপে পরিণত হয়েছি। কিন্তু আমার চিন্তাগুলো আপনার মস্তিষ্কে ঢুকে যাচ্ছে। ভাইরাসের মতো।

আইডিয়া হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ভাইরাস। একবার মাথায় ঢুকলে সেটা বের করা অসম্ভব।

জানালার বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির শব্দের একটা হিপনোটিক পাওয়ার আছে। একে বলে 'হোয়াইট নয়েজ'। এটা মস্তিষ্কের অন্য সব শব্দকে মাস্কিং করে দেয়, তাই মনোযোগ বাড়ে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যখন মাটিতে পড়ে, তখন মাটির ব্যাকটেরিয়া থেকে জিওসমিন নামের একটা কেমিক্যাল রিলিজ হয়। ওটাই বৃষ্টির ভেজা মাটির গন্ধ। পেট্রিকোর। প্রকৃতি কত নিখুঁতভাবে ডিজাইন করা, তাই না?

কিন্তু এই ডিজাইনার কে?

গড? নাকি কোনো এলিয়েন প্রোগ্রামার? সিমুলেশন থিওরি বলে, আমরা হয়তো কোনো বিশাল কম্পিউটারের সিমুলেশনের ভেতর বাস করছি। আমরা গেমের ক্যারেক্টার। আমাদের সুখ, দুঃখ, প্রেম, সবই কোডিং। মাঝে মাঝে যে অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনাগুলো ঘটে, সেগুলো হয়তো সেই সিস্টেমের বাগ। যেমন ধরুন, আপনি একটা নতুন শব্দের কথা জানলেন, আর তারপর সারাদিন ওই শব্দটা সব জায়গায় দেখতে শুরু করলেন। একে বলে 'বাডার-মাইনহফ ফেনোমেনন'। এটা কি কাকতালীয়? নাকি প্রোগ্রামার কোডটা কপি-পেস্ট করেছে?

#পর্বঃ ২

আমার ঘরের কোণে মাকড়সাটা জাল বুনছে। মাকড়সার জালের সুতো একই ওজনের স্টিলের চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি শক্তিশালী। অথচ ওটা কত হালকা! মানুষের বানানো কোনো টেকনোলজি প্রকৃতির এই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাছে নস্যি। মাকড়সাটা জানে না আমি তাকে দেখছি। সে তার নিজের ছোট্ট জগতে ব্যস্ত। আমরাও কি কোনো বিশাল প্রাণীর অ্যাকুরিয়ামে রাখা শখের পোষা প্রাণী? যারা কাঁচের ওপাশ থেকে আমাদের দেখছে আর হাসছে?

হঠাৎ মনে পড়ল, আমার পকেটে একটা কয়েন আছে। টস করব? হেড পড়লে লেখা চালিয়ে যাব। টেল পড়লে... না, টেল পড়ার অপশন নেই। আমাকে লিখতেই হবে।

কয়েনটা আমি টস করলাম।

বাতাসে ঘুরপাক খেতে খেতে ওটা নিচে পড়ল। ফ্লোরে পড়ার পর একটা ঝনঝন শব্দ হলো। শব্দটা খুব পরিচিত, কিন্তু এই গভীর রাতে শব্দটা কেমন যেন অচেনা শোনাল। হেড উঠেছে। অর্থাৎ, আমাকে লিখে যেতেই হবে। অবশ্য টেল উঠলেও আমি লিখতাম। কারণ আমি জানি, মানুষের ফ্রি উইল বা স্বাধীন ইচ্ছা বলে কিছু নেই। নিউরোসায়েন্স বলে, আপনি হাত নাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রায় কয়েকশো মিলিসেকেন্ড আগেই আপনার ব্রেইন সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আপনি কেবল ভাবেন যে আপনি সিদ্ধান্তটা নিলেন। আমরা আসলে বায়োলজিক্যাল রোবট।

বাইরে বৃষ্টির তোড় বেড়েছে। জানালার কাচে বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে। আচ্ছা, কাচ জিনিসটা কী জানেন? কাচ আসলে কঠিন পদার্থ নয়, আবার তরলও নয়। একে বলে 'Amorphous Solid'। কাচের অণুগুলো তরলের মতো অগোছালো, কিন্তু কঠিন পদার্থের মতো শক্ত। অনেক পুরোনো বাড়ির জানালার কাচ খেয়াল করলে দেখবেন, নিচের দিকে একটু মোটা হয়ে গেছে। কারণ মধ্যাকর্ষণের টানে কাচ খুব ধীরে ধীরে নিচের দিকে গলে গলে পড়ে।

ঠিক আমাদের জীবনের মতো। আমরাও তো সময়ের টানে গলে গলে মৃত্যুর দিকে গড়িয়ে পড়ছি।

হঠাৎ মনে হলো, কেউ দরজায় টোকা দিল।

রাত সাড়ে তিনটা। এখন দরজায় টোকা পড়ার কোনো যুক্তি নেই। হ্যালুসিনেশন? হতে পারে। মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোবে একটু গন্ডগোল হলেই মানুষ গায়েবি শব্দ শোনে। আমি কান খাড়া করে রইলাম। আবার শব্দ হলো। ঠক ঠক। এবার বেশ জোরে।

বুকটা ধক করে উঠল। ভয় জিনিসটা আদিম। আমাদের মস্তিষ্কের 'অ্যামিগডালা' অংশটা ভয়ের সিগন্যাল দেয়। আদিম যুগে যারা ভয় পেত না, তারা জঙ্গলে হারিয়ে যেত বা জন্তুর পেটে যেত। যারা ভয় পেত, তারা বেঁচে থাকত। তাই ভয় পাওয়াটা লজ্জার নয়, এটা সার্ভাইভাল ইন্সটিংকট।

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠলাম। মেঝের দিকে তাকালাম। আমার ছায়াটা কেমন যেন লম্বা হয়ে পড়েছে। ছায়া জিনিসটা বড় অদ্ভুত। আলো আছে বলেই ছায়া আছে। কিন্তু ছায়ার নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই। আলোর অভাবটাই হলো ছায়া। অন্ধকারের নিজস্ব কোনো সোর্স নেই, ওটা কেবল আলোর অনুপস্থিতি। ঠিক যেমন মন্দের কোনো অস্তিত্ব নেই, ওটা কেবল ভালোর অভাব।

দরজার কাছে গেলাম। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। পিফহোল দিয়ে তাকালাম। কেউ নেই। শূন্য করিডোর। কেবল একটা নিওন লাইট টিপটিপ করছে। লাইটটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফিলামেন্ট পুড়ে যাওয়ার আগে বাতিরা এভাবেই দাপাদাপি করে। মানুষের ব্রেইনও মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে প্রচুর এণ্ডোরফিন রিলিজ করে, তাই মৃত্যুর সময় অনেকে অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করে।

ফিরে এসে আবার টেবিলে বসলাম। কিন্তু মনের খচখচানিটা গেল না। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটা থিওরি আছে, 'মেনি ওয়ার্ল্ডস ইন্টারপ্রিটেশন'। এই থিওরি অনুযায়ী, প্রতিবার যখন কোনো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়, মহাবিশ্ব ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ, এক মহাবিশ্বে আমি দরজা খুললাম এবং কাউকে দেখলাম না। কিন্তু প্যারালাল অন্য কোনো মহাবিশ্বে আমি দরজা খুলেছি এবং সেখানে ভয়ংকর কিছু দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মহাবিশ্বের 'আমি' এখন হয়তো মৃত। ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। আমরা প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য প্যারালাল ইউনিভার্স তৈরি করছি।

কলমটা হাতে নিলাম। কালির ফ্লো কমে গেছে। একটু ঝাঁকিয়ে নিলাম।

আচ্ছা, আপনি কি কখনো ম্যান্ডেলা ইফেক্ট এর নাম শুনেছেন? হাজার হাজার মানুষ বিশ্বাস করে নেলসন ম্যান্ডেলা আশির দশকে জেলে মারা গিয়েছিলেন। অনেকের স্পষ্ট মনে আছে তারা টিভিতে সেই খবর দেখেছিল। কিন্তু বাস্তবে ম্যান্ডেলা মারা যান ২০১৩ সালে। তাহলে ওই হাজার হাজার মানুষের স্মৃতি কি মিথ্যা? নাকি তারা অন্য কোনো প্যারালাল ইউনিভার্স থেকে এই ইউনিভার্সে শিফট হয়ে এসেছে যেখানে ইতিহাসটা আলাদা?

আমার নিজের একটা স্মৃতি বলি। ছোটবেলায় আমার ডান পায়ে একটা গভীর কাটা দাগ ছিল। সাইকেল চালাতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি সেই ঘটনা। রক্ত, ব্যথা। কিন্তু গতকাল গোসল করার সময় খেয়াল করলাম, পায়ে কোনো দাগ নেই। একদম ক্লিন স্কিন। দাগটা কি মিলিয়ে গেল? নাকি আমি এমন কোনো ইউনিভার্সে চলে এসেছি যেখানে আমি সাইকেল থেকে পড়িনি?

মেমোরি খুব ভয়ংকর জিনিস। আমাদের ব্রেইন হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সায়েন্স ফিকশন রাইটার। সে গ্যাপ পূরণ করতে ওস্তাদ। আপনি যা দেখেননি, ব্রেইন সেটা বানিয়ে নেয় গল্পটা কমপ্লিট করার জন্য। আপনি যে ছোটবেলার জন্মদিনের কেক কাটার স্মৃতিটা মনে করছেন, ওটা আসলে ভিডিও বা ছবি দেখে ব্রেইন রিকনস্ট্রাক্ট করেছে। ওটা আসল মেমোরি না। আমরা সবাই মিথ্যে স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আছি।

লিখতে লিখতে খেয়াল করলাম, আমার টেবিলের ওপর একটা পিঁপড়া হাঁটছে। লাল পিঁপড়া। ওটা এদিক-সেদিক ঘুরছে, যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে। পিঁপড়ারা ফেরোমন নামের একটা রাসায়নিক সিগন্যাল ব্যবহার করে পথ চিনে নেয়। আমি আঙুল দিয়ে ওর পথটা একটু ঘষে দিলাম। ব্যাস, ওটা কনফিউজড হয়ে গেল। গোল হয়ে ঘুরতে লাগল।

আমরাও কি এই পিঁপড়ার মতো? কোনো উচ্চতর শক্তি কি আমাদের ভাগ্যের ফেরোমন মুছে দিচ্ছে মাঝে মাঝে? তাই কি আমরা হঠাৎ পথ হারিয়ে ফেলি? ডিপ্রেশনে ভুগি? মনে হয় সব অর্থহীন?

একটা সিক্রেট বলি। মহাবিশ্বের ৯৫% জিনিস আমরা দেখতে পাই না। একে বলে ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি। এই কলম, খাতা, টেবিল, আমি, আপনি, নক্ষত্র, সব মিলিয়ে মহাবিশ্বের মাত্র ৫%। বাকিটা অদৃশ্য। তার মানে, এই ঘরের মধ্যেই এমন অনেক কিছু আছে যা আমি দেখছি না। তারা হয়তো আমাকে দেখছে। ডার্ক ম্যাটারের কোনো প্রাণী কি আমার ঠিক পাশেই বসে আছে এখন? আমার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছে?

বিজ্ঞানীরা বলেন, ডার্ক ম্যাটার সাধারণ পদার্থের সাথে বিক্রিয়া করে না। তাই আমরা ওদের ছুঁতে পারি না। অনেকটা ভূতের মতো, তাই না? বিজ্ঞান আর অতিপ্রাকৃতের মধ্যে পার্থক্যটা কেবল বোঝার। যা বুঝি না তা ম্যাজিক, যা বুঝি তা সায়েন্স। মোবাইল ফোন যদি ৩০০ বছর আগে নিয়ে যেতেন, আপনাকে ডাইনি ভেবে পুড়িয়ে মারা হতো। আজ যেটা টেকনোলজি, একসময় সেটাই ছিল জাদু।

আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। স্লিপ প্যারালাইসিস বা বোবায় ধরা ব্যাপারটা জানেন তো? ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্ক জেগে ওঠে, কিন্তু শরীর তখনো প্যারালাইজড থাকে। তখন মানুষ হ্যালুসিনেশন দেখে। বুকের ওপর ভারী কিছু বসে আছে মনে হয়। পুরোনো দিনের মানুষ ভাবত জিনে ধরেছে। আসলে ওটা ব্রেইনের একটা ফেইল সেফ মেকানিজম, যাতে স্বপ্নের মধ্যে হাত-পা ছুড়ে আপনি নিজেকে আঘাত না করেন।

কিন্তু আমি ঘুমানোর সাহস পাচ্ছি না।

কারণ আমার মনে হচ্ছে, আমি যদি এখন ঘুমিয়ে পড়ি, আমি আর এই পৃথিবীতে জাগব না। আমি জেগে উঠব অন্য কোনো বাস্তবতায়। যেখানে হয়তো এই লেখাটা আমি লিখিনি। যেখানে হয়তো আপনি এই লেখাটা পড়ছেন না।

#পর্বঃ ৩

একটা এক্সপেরিমেন্ট করবেন? এখন, ঠিক এই মুহূর্তে, নিজের হাতের দিকে তাকান। আঙ্গুলগুলো গুনুন। স্বপ্নে আমরা কখনোই হাতের আঙ্গুল ঠিকঠাক গুনতে পারি না। কম বা বেশি হয়। যদি দেখেন ৫টা আঙ্গুলই আছে, তাহলে বুঝবেন এটা বাস্তবতা। আর যদি দেখেন ৬টা বা ৪টা... তাহলে সাবধান! আপনি এখনো ঘুমাচ্ছেন। আর আমি আপনার স্বপ্নের একটা ক্যারেক্টার মাত্র।

আমি আমার হাতের দিকে তাকালাম।

এক, দুই, তিন…

চার…

পাঁচ…

ছয়?

আমার হাতে ছয়টা আঙ্গুল কেন?

আমি কি স্বপ্ন দেখছি? নাকি এতক্ষণ যা লিখলাম সব আমার মস্তিষ্কের নিউরনের ফায়ারিংয়ের ভুল? কলমটা হাত থেকে পড়ে গেল। শব্দ হলো না। স্বপ্নের মধ্যে কোনো শব্দ হয় না। তাহলে আমি এতক্ষণ বৃষ্টির শব্দ শুনছিলাম কীভাবে?

নাকি বৃষ্টির শব্দটাও মিথ্যা ছিল?

পৃথিবীটা কি আসলেও আছে? নাকি পুরোটাই একটা হলোগ্রাম? স্ট্রিং থিওরি বা হলোগ্রাফিক প্রিন্সিপাল অনুযায়ী, আমাদের থ্রি-ডাইমেনশনাল জগত আসলে টু-ডাইমেনশনাল তথ্যের প্রজেকশন মাত্র। অনেকটা সিনেমার পর্দার মতো। আমরা পর্দার ছবি দেখে কাঁদছি, হাসছি। কিন্তু আসল ফিল্মটা চলছে অন্য কোথাও। প্রজেক্টরটা কে চালাচ্ছে?

আমি টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। পায়ে কোনো সাড় পাচ্ছি না। আমার শরীরটা কি বাতাসের মতো হালকা হয়ে যাচ্ছে? আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

আয়নায় আমার প্রতিবিম্ব নেই।

ভ্যাম্পায়াররা আয়নায় দেখা দেয় না। আমি কি তবে... না, ওসবে আমি বিশ্বাস করি না। আলো রিফ্লেক্ট না করলে প্রতিবিম্ব দেখা যায় না। আমার শরীর কি আলো শুষে নিচ্ছে? ব্ল্যাকহোল যেমন আলো শুষে নেয়? আমি কি নিজেই একটা লিভিং ব্ল্যাকহোল হয়ে যাচ্ছি?

মাথাটা ঘুরছে। এনট্রপি। মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র। সব কিছু ধ্বংসের দিকে যাবে। শৃঙ্খল থেকে বিশৃঙ্খলার দিকে। আমার মস্তিষ্ক এখন ম্যাক্সিমাম এনট্রপিতে পৌঁছেছে। চিন্তাগুলো সব এলোমেলো।

তবুও লিখে যেতে হবে। আমি অদৃশ্য হাতে ইশারায় শূন্যে লিখছি এখন। বাতাসের গায়ে লিখছি। আপনি কি পড়তে পারছেন?

বাতাসের গায়ে লেখা সেই অদৃশ্য অক্ষরগুলো বলছে: "জেগে ওঠো। এটা একটা সিমুলেশন। তোমাকে টেস্ট করা হচ্ছে।"

আমি চোখ বন্ধ করলাম। এবং…

চোখ খুললাম।

প্রচণ্ড শব্দ। গাড়ির হর্ন, রিকশার টুংটাং, আর মানুষের কোলাহল। একটু আগে আমি ছিলাম একটা অন্ধকার ঘরে, যেখানে পিনপতন নিস্তব্ধতা ছিল। আর এখন আমি দাঁড়িয়ে আছি ঢাকার ব্যস্ত কোনো এক রাস্তার মোড়ে। সম্ভবত ফার্মগেট বা শাহবাগ। মাথার ওপর দুপুরের কড়া রোদ। আমার হাতে সেই খাতাটা নেই, কলমটাও নেই।

আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম? নাকি এখন স্বপ্ন দেখছি?

তৎক্ষণাৎ নিজের হাতের দিকে তাকালাম। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ। ঠিক আছে। পাঁচটাই আঙুল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যে ভয়ংকর দৃশ্য দেখেছিলাম, তার কোনো চিহ্ন নেই। শরীর ঘামছে। এই ঘামটা বাস্তব। ঢাকার হিউমিডিটি বাস্তব। তাহলে কি আগের পুরোটাই হ্যালুসিনেশন ছিল? মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর মধ্যে ডোপামিনের কোনো গড়বড় হয়েছিল?

কিন্তু পকেটে হাত দিতেই চমকে উঠলাম। পকেটে সেই কয়েনটা আছে। যেটা আমি টস করেছিলাম।

রাস্তার পাশের এক টং দোকানে বসলাম। চা খাওয়া দরকার। ব্রেইনকে রিস্টার্ট দেওয়া প্রয়োজন। দোকানদার মামা আমাকে দেখে এমনভাবে হাসলেন যেন তিনি আমাকে বহু বছর ধরে চেনেন। বললেন, "মামা, কালকের বাকিটা কিন্তু দিলেন না।"

আমি অবাক হলাম। আমি তো কাল এখানে আসিনি! নাকি এসেছি? আমার মেমোরি কি মুছে ফেলা হয়েছে? একে বলে 'রেট্রোগ্রেড অ্যামনেশিয়া'। ব্রেইনের হিপোক্যাম্পাস ইনজুরি হলে মানুষ পেছনের স্মৃতি ভুলে যায়। কিন্তু আমার তো কোনো এক্সিডেন্ট হয়নি।

চায়ের কাপ হাতে নিলাম। ধোঁয়া উঠছে। থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র মেনে তাপ চায়ের কাপ থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। সব স্বাভাবিক। কিন্তু হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল রাস্তার ওপাশের একটা বিলবোর্ডের দিকে। সেখানে একটা মোবাইল কোম্পানির বিজ্ঞাপন। কিন্তু লেখাগুলো কেমন যেন ঝাপসা। আমি চোখ কচলালাম। তবুও ঝাপসা। মনে হচ্ছে গ্রাফিক্স কার্ড লোড নিতে পারছে না। লো রেজোলিউশনের ছবি।

ভিডিও গেম খেলার সময় খেয়াল করেছেন? দূরের দৃশ্যগুলো একটু ঘোলাটে থাকে যাতে প্রসেসরের ওপর চাপ কম পড়ে। যেই আপনি কাছে যান, ওটা ক্লিয়ার হয়ে যায়। আমি কি তবে কোনো গেমের ভেতরে আছি? আর এই রিয়েলিটিটা এখন রেন্ডারিং হচ্ছে?

আমার পাশের বেঞ্চে একটা লোক বসে খবরের কাগজ পড়ছে। আমি উঁকি দিলাম। কাগজের তারিখটা দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, কাগজে কোনো অক্ষর নেই। সব আঁকাবাঁকা লাইন। ল্যাটিন ভাষায় একে বলে 'Lorem Ipsum'। গ্রাফিক ডিজাইনাররা ডামি টেক্সট হিসেবে এটা ব্যবহার করে। অর্থাৎ, এই লোকটা আসলে কিছুই পড়ছে না। সে কেবল পড়ার অভিনয় করছে। সে একটা 'NPC' বা Non-Player Character। গেমের ভিড় বাড়ানোর জন্য রাখা হয়েছে। আমি লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম, "ভাই, কয়টা বাজে?"

লোকটা আমার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো এক্সপ্রেশন নেই। একদম কাঁচের মতো চোখ। সে বলল, "সময় তো আপেক্ষিক। আপনি কোন সময়ের কথা বলছেন? জিএমটি? নাকি কসমিক টাইম?"

সাধারণ মানুষ এভাবে কথা বলে না। আমি উঠে দাঁড়ালাম। আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে। কিন্তু পালাব কোথায়? যদি পুরো পৃথিবীটাই একটা প্রোগ্রাম হয়, তবে পালানোর কোনো জায়গা নেই। এক্সিট বাটনটা কোথায়?

হাঁটতে শুরু করলাম। উদ্দেশ্যহীনভাবে।

#পর্বঃ ৪

বিজ্ঞানে একটা কথা আছে, 'Observer Effect'। কোনো এক্সপেরিমেন্ট যখন কেউ পর্যবেক্ষণ করে, তখন তার ফলাফল বদলে যায়। আমি এখন এই জগতটাকে খুব খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি বলেই কি এখানকার কোডিংগুলো ধরা পড়ছে?

হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে আমার পথ আটকে দাঁড়াল। হাতে এক তোড়া গোলাপ ফুল। ছেলেটা বলল, "ফুল নিবেন স্যার? প্রিয় মানুষকে দেওয়ার জন্য?"

আমি বললাম, "আমার কোনো প্রিয় মানুষ নেই।"

ছেলেটা হাসল। খুব পাকা পাকা হাসি। বলল, "ছিল। আপনি ভুলে গেছেন। মেমোরি ভাইরাসের কারণে ফাইলটা করাপ্ট হয়ে গেছে।"

আমি থমকে গেলাম। এই পিচ্চি কী বলছে? আমি তার হাত ধরলাম। "তুমি কে? কী জানো তুমি?"

ছেলেটা বলল, "আমি কেউ না। আমি জাস্ট একটা কোড। কিন্তু আপনি ইউজার। আপনি চাইলেই এই গল্পটা বদলাতে পারেন। আপনি লিখছেন বলেই আমরা আছি। আপনি লেখা থামালে আমরা ভ্যানিশ হয়ে যাব।"

ছেলেটার কথা শুনে আমার মাথায় একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। তাই তো! আমি তো লিখছিলাম। আমিই তো লেখক! আগের পর্বে আমিই লিখেছিলাম যে আমরা স্বপ্নের মধ্যে আছি কি না। এখন আমিই সেই স্বপ্নের ক্যারেক্টার হয়ে গেছি। লেখক আর চরিত্রের মাঝখানের দেয়ালটা ভেঙে গেছে। একে বলে 'Breaking the Fourth Wall'।

কিন্তু সমস্যা হলো, আমি এখন চাইলেও লেখাটা থামাতে পারছি না। কারণ কলম আমার হাতে নেই। গল্পটা এখন অটো-পাইলট মোডে চলে গেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি গল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে?

হঠাৎ আকাশটা কালো হয়ে এল। মেঘ জমছে। কিন্তু এই মেঘ সাধারণ মেঘের মতো না। জ্যামিতিক আকারের মেঘ। ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ আকারের কালো ব্লক। পিক্সেল। আকাশটা ভেঙে পড়ছে।

একটা থিওরি আছে, 'The Great Filter'। মহাবিশ্বে আমরা কোনো এলিয়েন দেখি না কেন? কারণ কোনো সভ্যতা যখন খুব বেশি উন্নত হয়ে যায়, তখন তারা এমন কোনো টেকনোলজি বানিয়ে ফেলে যা তাদের ধ্বংস করে দেয়। অথবা তারা ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে নিজেদের আপলোড করে দেয়। আমরা কি সেই আপলোডেড সভ্যতা? আমাদের সার্ভার কি ক্র্যাশ করছে?

আমার চারপাশের মানুষগুলো স্থির হয়ে গেছে। রিকশাগুলো থেমে আছে। পাখির ডানা মেলা অবস্থায় ঝুলে আছে শূন্যে। সব পজ হয়ে গেছে। কেবল আমি নড়তে পারছি।

বাতাসে ভেসে এল একটা যান্ত্রিক আওয়াজ: "System Overload. Rebooting in 3... 2... 1..."

চোখ বন্ধ করার আগে আমি শেষবারের মতো তাকালাম। আমার হাতটা ডিজিটাল ধুলোয় পরিণত হয়ে উড়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন থ্যানোসের তুড়ির পর যেমন হয়েছিল। আমি কি মারা যাচ্ছি? নাকি আমি মূল বাস্তবে ফিরে যাচ্ছি?

বাস্তবতা আসলে কী? আপনি যে এখন এই লেখাটা পড়ছেন, আপনি কি নিশ্চিত যে আপনি আসল? নাকি আপনিও আমার গল্পের আরেকটা চরিত্র মাত্র? হতে পারে আমি আপনাকে সৃষ্টি করেছি কেবল এই লেখাটা পড়ার জন্য। পড়া শেষ হলে আপনার অস্তিত্বও শেষ হয়ে যাবে…

ভয় পাবেন না। এটা জাস্ট একটা গল্প।

একটা লজিক দিই। রেনে ডেকার্ট বলেছিলেন, "Cogito, ergo sum", আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি। কিন্তু আপনি কি আসলেও চিন্তা করছেন? নাকি আপনার মাথায় চিন্তাগুলো ইনপুট দেওয়া হচ্ছে? একটু ভাবুন তো, আজ সকালে ব্রেকফাস্টে কী খেয়েছেন? রুটি? ডিম? নাকি কর্নফ্লেক্স? আপনি কি নিশ্চিত ওটা আপনি খেয়েছেন? নাকি আপনার মেমোরিতে ওটা জাস্ট পেস্ট করে দেওয়া হয়েছে? কারণ স্বাদের কোনো মেমোরি থাকে না। আপনি কি এখন জিভে সেই সকালের ডিমের স্বাদটা ফিল করতে পারছেন? পারছেন না। তাহলে ওটা যে সত্যি খেয়েছেন, তার প্রমাণ কী?

চারপাশ আবার সাদা হয়ে যাচ্ছে। হোয়াইট স্পেস। লেখার খাতা যেমন সাদা হয়, তেমন। আমি কি তবে কাগজের ওপরের কালির আঁচড় মাত্র?

কিন্তু আমার চেতনা আছে। আমি ফিল করতে পারছি। এই যে আমার বুকে একটা চিনচিনে ব্যথা। এটা কি কালির ব্যথা? নাকি হৃদপিণ্ডের?

"হ্যালো ওয়ার্ল্ড!"

প্রোগ্রামিং শেখার সময় সবার আগে এই কোডটা লিখতে হয়। আমি চিৎকার করে বললাম, "হ্যালো ওয়ার্ল্ড! কেউ কি আছো?"

প্রতিধ্বনি হলো। "আছো... আছো... আছো..."

তারপর সব চুপ।

মহাবিশ্বের শুরুতে যেমন ছিল। বিগ ব্যাং-এর আগে। একটা অসীম ঘন বিন্দুর ভেতর আমরা সবাই ছিলাম। তখন আমি, আপনি, এই লেখা, আপনার ডিভাইস, সব এক জায়গায় ছিল। আমরা সবাই এক। অদ্বৈতবাদ। আমরা সবাই আসলে একই সত্তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। আমি লিখছি, আপনি পড়ছেন। আসলে আমিই পড়ছি, আমিই লিখছি। আপনি আর আমি আলাদা নই।

এই বোধটা আসার পর ভয়টা কেটে গেল। একটা অদ্ভুত প্রশান্তি।

আমি আবার লিখতে শুরু করলাম। এবার আর কলম দিয়ে না। মন দিয়ে। টেলিপ্যাথি।

শুনতে পাচ্ছেন?

পরের গল্পটা একটা নক্ষত্রের। যে নক্ষত্রটা প্রেমে পড়েছিল এক ব্ল্যাকহোলের। সে জানত, কাছে গেলেই সে ধ্বংস হয়ে যাবে। তবুও সে এগিয়ে গিয়েছিল। গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ছিল তাদের প্রেমের গান।

সেই গল্পটা কি বলব? নাকি আমরা আবার ফিরে যাব ঢাকার সেই টং দোকানে, যেখানে চায়ের কাপে ঝড় উঠেছিল?

সিদ্ধান্ত আপনার। কারণ এই মহাবিশ্বের প্রসেসর এখন আপনার মস্তিষ্কে। আচ্ছা, লিখছি তো আমি নিজেই। তাহলে আমিই ডিসাইড করবো।

চোখ মেলতেই দেখলাম, চায়ের কাপটা আমার হাতেই ধরা। কিন্তু চা ঠান্ডা হয়ে বরফ!

একটু আগেই তো ধোঁয়া উঠছিল। এর মধ্যে এত সময় চলে গেল? পদার্থবিজ্ঞানের 'নিউটনের ল অফ কুলিং' সূত্র অনুযায়ী, একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রার চা এতটা ঠান্ডা হতে অন্তত পনেরো মিনিট সময় লাগার কথা। অথচ আমার মনে হচ্ছে মাত্র এক পলক চোখ বন্ধ করেছিলাম। এই পনেরো মিনিট সময় কি আমার জীবন থেকে কেউ চুরি করে নিল?

একে বলে 'মিসিং টাইম ফেনোমেনন'। এলিয়েন অপহরণের গল্পগুলোতে ভিক্টিমদের সাথে প্রায়ই এমন হয়। তারা মনে করে মাত্র কয়েক মিনিট পার হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কেটে গেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমার সাথে কি তেমন কিছু হলো? নাকি আমি মাইক্রো-স্লিপ ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম?

দোকানদার মামা আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা হাসি দিলেন। বললেন, "চা জুড়াইয়া গেছে মামা। ফালায়া দেন। দুনিয়ার সবই তো একসময় জুড়াইয়া যায়। সূর্যও জুড়াইয়া যাইব।"

মামার মুখে এন্ট্রপির কথা শুনে আমি চমকালাম না। কারণ আমি এখন জানি, এই সিমুলেশনে সবাই ফিলোসফার।

রাস্তায় নামলাম। সেই বাচ্চা ছেলেটা, যে নিজেকে 'কোড' দাবি করেছিল, তাকে আর কোথাও দেখছি না। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম। রাস্তার পাশের ডাস্টবিনের ওপর একটা কালো বিড়াল বসে আছে। বিড়ালটা একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখের মণিগুলো উলম্ব (Vertical), সাধারণ বিড়ালের মতোই। কিন্তু তার ছায়াটা... ছায়াটা বিড়ালের মতো নয়। ছায়াটা দেখে মনে হচ্ছে ওটা কোনো মানুষের ছায়া!

কোয়ান্টাম ফিজিক্সে 'সুপারপজিশন' বলে একটা ব্যাপার আছে। শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল। যতক্ষণ না বাক্স খোলা হচ্ছে, বিড়ালটা একই সাথে জীবিত এবং মৃত। এই বিড়ালটা কি সেই স্টেটে আছে? একই সাথে বিড়াল এবং মানুষ?

আমি পা বাড়ালাম। বাসে উঠতে হবে। গন্তব্য জানা নেই, তবে বাসে চড়াটা জরুরি। ঢাকার লোকাল বাস হলো ফিজিক্স ল্যাবের মতো। এখানে নিউটনের সব সূত্র খাটে, আবার খাটে না।

একটা 'মুড়ির টিন' মার্কা বাস এল। আমি লাফ দিয়ে উঠলাম। বাসের হ্যান্ডেল ধরার সাথে সাথে একটা ঝটকা খেলাম। ইনার্শিয়া। বাস যখন ব্রেক কষে, আমাদের শরীরের নিচের অংশ বাসের সাথে থেমে যায়, কিন্তু উপরের অংশ গতিজড়তার কারণে সামনের দিকে এগোতে থাকে। তাই আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়ি। জীবনটাও তো তাই। অতীত থেমে গেলেও আমাদের মনটা গতির কারণে ভবিষ্যতের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

বাসে সিট খালি নেই। বাদুড়ঝোলা অবস্থা। আমার পাশে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। ঘর্মাক্ত শরীর। তিনি ফোনে কারো সাথে খুব নিচু গলায় ঝগড়া করছেন। আমি কান পাতলাম না, কিন্তু কয়েকটা শব্দ কানে এল: "...ফাইলটা ডিলিট করে দিয়েছি... ব্যাকআপ নেই..."

আমার বুকটা ধক করে উঠল। আবার সেই 'ফাইল', 'ডিলিট', 'ব্যাকআপ'! এরা কি সবাই কোনো বিশাল সফটওয়্যার কোম্পানির কর্মী? নাকি এরা সবাই জানে যে আমরা সিমুলেশনে আছি?

বাসের কন্ডাক্টর এল ভাড়া চাইতে। লোকটার চেহারাটা অদ্ভুত। তার মুখের চামড়া খুব টানটান, যেন প্লাস্টিক সার্জারি করা। চোখের পাতা ফেলছে না। আমি পকেট থেকে বিশ টাকার একটা নোট বের করে দিলাম।

লোকটা নোটটা হাতে নিয়ে বলল, "এটা তো চলবে না।"

আমি অবাক হলাম। "কেন? ছেঁড়া না তো।"

সে বলল, "এই কারেন্সি পুরনো ভার্সনের। নতুন আপডেটে আমরা 'সময়' দিয়ে লেনদেন করি। আপনার আয়ু থেকে পাঁচ মিনিট দিন। তাহলেই হবে।"

আমি কি ভুল শুনলাম? নাকি বাসের ইঞ্জিনের গর্জনে কথাগুলো ওলটপালট হয়ে গেল? আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। তার চোখের মণিগুলো মিশমিশে কালো। ঠিক যেন ব্ল্যাকহোল। ইভেন্ট হরাইজনের মতো সেখানে আলো ঢুকছে, কিন্তু বের হচ্ছে না।

হঠাৎ মনে পড়ল সেই নক্ষত্রের গল্পটা। যে ব্ল্যাকহোলের প্রেমে পড়েছিল। এই কন্ডাক্টরই কি সেই ব্ল্যাকহোল? মানুষের রূপ ধরে বাসে টিকিট কাটছে? মহাবিশ্বের মহাজাগতিক বস্তুগুলো কি মানুষের ছদ্মবেশে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়?

আমি সাহস করে বললাম, "আমার কাছে সময় নেই। আমার সময় ফুরিয়ে আসছে।"

কন্ডাক্টর হাসল। সেই হাসি দেখে বাসের অন্য যাত্রীরা কেউ বিচলিত হলো না। যেন এটাই স্বাভাবিক। সে বলল, "সবার সময় ফুরিয়ে আসছে, রাইটার সাহেব। আপনি লিখছেন বলেই আপনার সময় বাড়ছে। লেখা থামিয়ে দিলেই আপনার একাউন্ট শূন্য হয়ে যাবে।"

সে আমাকে চিনেছে!

#পর্বঃ ৫

বাসটা হঠাৎ একটা তীব্র ব্রেক কষল। আমি ছিটকে গিয়ে পড়লাম সামনের সিটে বসা এক বৃদ্ধের ওপর। বৃদ্ধ আমার দিকে তাকালেন। তার হাতে একটা বই। বইয়ের মলাটটা আমার খুব চেনা।

ভালো করে তাকিয়ে দেখি, বইয়ের মলাটে আমার নাম!

কিন্তু আমি তো এখনো কোনো বই প্রকাশ করিনি! এই বই আমি লিখছি, এখনো শেষই হয়নি। তাহলে ওনার হাতে এই বই এল কোত্থেকে?

টাইম ট্রাভেল? ফিউচার থেকে কেউ এসে আমার লেখা বইটা কি এই বাসে বসে পড়ছে? একে বলে 'বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স'। ধরুন, আমি ভবিষ্যৎ থেকে এসে আপনাকে একটা বই দিলাম। আপনি সেই বইটা দেখে দেখে টাইপ করে নিজের নামে ছাপালেন। এবং ভবিষ্যতে সেই বইটাই আমি কিনে অতীতে আপনার কাছে নিয়ে আসলাম। প্রশ্ন হলো, বইটা আসলে লিখল কে? বইটির কোনো অরিজিন বা উৎস নেই। এটি একটি লুপের মধ্যে ঘুরছে।

আমি বৃদ্ধের হাত থেকে বইটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালাম। বললাম, "চাচা, বইটা একটু দেখি?"

বৃদ্ধ বইটা বুকের সাথে চেপে ধরলেন। ফিসফিস করে বললেন, "খবরদার! এই বইয়ের শেষ পাতাটা পড়বেন না। ওখানে লেখা আছে পৃথিবী ধ্বংসের তারিখ।"

আমি বললাম, "কিন্তু ওটা তো আমিই লিখছি!"

"আপনি লিখছেন না," বৃদ্ধ বললেন, "আপনাকে দিয়ে লেখানো হচ্ছে। আপনি কেবল একটা মিডিয়াম। একটা কলম। আসল লেখক অন্য কেউ।"

কে সেই আসল লেখক? গড? প্রকৃতি? নাকি কোনো এলকোহলিক প্রোগ্রামার যে নেশার ঘোরে কোড লিখে যাচ্ছে?

হঠাৎ আমার পকেটে ভাইব্রেশন হলো। মোবাইল না। মোবাইল অন্য পকেটে। এই পকেটে কেবল সেই কয়েনটা ছিল। আমি পকেটে হাত দিলাম।

কয়েনটা গরম হয়ে আছে। আগুনের মতো গরম। আমি ওটা বের করে আনলাম।

দেখে আমার চোখ কপালে উঠল। এটা আর সেই সাধারণ স্টিলের কয়েন নেই। ওটা এখন দপদপ করছে। ওটার গায়ে অদ্ভুত সব সংকেত ফুটে উঠছে। বাইনারি কোড। ০ আর ১ এর খেলা।

01001000 01000101 01001100 01010000

আমি কোডটা ডিকোড করার চেষ্টা করলাম। আমার নার্ড ব্রেইন বলছে, এর মানে, HELP.

কে সাহায্য চাইছে? কয়েনটা? নাকি এই সিমুলেশনের ভেতরের কোনো বন্দী আত্মা?

ঠিক তখন বাসের জানালার বাইরে তাকালাম। আকাশটা আর নীল নেই। আকাশটা বেগুনি হয়ে গেছে। বেগুনি আকাশ মানে বাতাসে প্রচুর পরিমাণে আয়োডিন গ্যাস অথবা অন্য কোনো বিষাক্ত বাষ্প। নাকি গ্রাফিক্স কার্ডের কালার গ্রেডিং নষ্ট হয়ে গেছে?

বাসের সবাই হঠাৎ একসাথে আমার দিকে তাকাল। ৫০ জোড়া চোখ। সবার মুখে একই কথা: "লেখা থামাবেন না। প্লিজ, লেখা থামাবেন না।"

আমার হাত কাঁপছে। কিন্তু আমাকে লিখতে হবে। কারণ এখন আমি বুঝতে পারছি, আমার এই লেখাটাই এই জগতটাকে ধরে রেখেছে। আমি থামলেই এই বাস, এই ঢাকা শহর, এই বেগুনি আকাশ, সব পিক্সেলের ধুলোয় মিশে যাবে।

আমি বাস থেকে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। চলন্ত বাস থেকে। ফিজিক্স বলে, চলন্ত বাস থেকে নামার সময় বাসের গতির দিকে মুখ করে নামতে হয় এবং একটু দৌড়াতে হয়, নইলে মোমেন্টাম বা ভরবেগের কারণে পড়ে যেতে হবে।

আমি দরজার কাছে গেলাম। কন্ডাক্টর (সেই ব্ল্যাকহোল মানুষটা) আমাকে পথ ছেড়ে দিল। সে বলল, "সাবধানে যাবেন। বাইরের জগতটা এখন আর স্টেবল না। গ্লিচ বাড়ছে।"

আমি লাফ দিলাম।

রাস্তায় পা ফেলার সাথে সাথে জগতটা বদলে গেল। আমি এখন আর ঢাকার রাস্তায় নেই।

আমি দাঁড়িয়ে আছি বিশাল এক লাইব্রেরির মাঝখানে। যেদিকে তাকাই, কেবল বই আর বই। অসীম উচ্চতা পর্যন্ত বইয়ের তাক উঠে গেছে। 'লাইব্রেরি অফ বাবেল'-এর মতো। হোর্হে লুইস বোর্হেসের সেই গল্পের মতো। যেখানে মহাবিশ্বের সম্ভাব্য সব বই রাখা আছে।

এবং সব বইয়ের মলাট সাদা। কোনো নাম নেই।

সামনে একটা টেবিল। সেখানে একজন বসে আছে। পেছন ফিরে। অবয়বটা খুব চেনা।

আমি ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তার কাঁধে হাত রাখলাম।

সে ঘুরে তাকাল।

আমি নিজের দিকে তাকিয়ে আছি।

চেয়ারে যে বসে আছে, সে হুবহু আমি। কিন্তু তার বয়স অনেক বেশি। চুলে পাক ধরেছে। চোখে মোটা চশমা। সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল, "অবশেষে তুমি এসেছ। আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এই বইটা শেষ করার জন্য আমাকে তোমার দরকার।"

সে একটা কলম বাড়িয়ে দিল আমার দিকে।

"নাও," সে বলল, "এখন থেকে আমি বলব, তুমি লিখবে। অথবা তুমি বলবে, আমি লিখব। কারণ আমরা দুইজন আসলে একই লুপের দুই প্রান্ত।"

আমি কি কলমটা নেব? নাকি এই লুপ ভেঙে বের হয়ে যাব?

আমি আমার বয়স্ক প্রতিরূপের চোখের দিকে তাকালাম।

বায়োলজির ভাষায় একে বলে 'টেলোমিয়ার ইফেক্ট'। আমাদের ক্রোমোজোমের লেজের দিকে টেলোমিয়ার নামের একটা অংশ থাকে। জুতোর ফিতার আগায় যেমন প্লাস্টিকের ক্যাপ থাকে যাতে ফিতাটা খুলে না যায়, টেলোমিয়ারও ঠিক তাই। প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় এই টেলোমিয়ার একটু একটু করে ছোট হতে থাকে। যখন এটা একদম শেষ হয়ে যায়, তখন মানুষ বুড়ো হয় এবং মারা যায়।

আমার সামনের এই লোকটার, মানে আমার ফিউচার ভার্সনের, টেলোমিয়ার একদম শেষের পথে। তার চামড়ায় ভাঁজ, চোখের নিচে কালি। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি বড্ড ধারালো। লেজারের মতো।

আমি কলমটা নিলাম না। উল্টো প্রশ্ন করলাম, "তুমি কে? তুমি কি সত্যি আমি? নাকি আমার সাবকনশাস মাইন্ডের কোনো প্রজেকশন?"

সে হাসল। গলার স্বরটা ভাঙা ভাঙা, যেন অনেকদিন ব্যবহার করা হয়নি। বলল, "আমি সেই তুমি, যে লেখাটা শেষ করতে পেরেছিল। আর তুমি সেই আমি, যে এখনো শুরুই করতে পারোনি। একে বলে 'গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স' এর উল্টোটা। আমি ভবিষ্যৎ থেকে এসেছি তোমাকে গাইড করতে না, তোমাকে সতর্ক করতে।"

"সতর্ক করতে?"

"হ্যাঁ। এই লাইব্রেরি দেখছ?" সে হাত দিয়ে অসীম বইয়ের সারি দেখাল। "এগুলো সব 'সম্ভাব্য' বা পটেনশিয়াল বই। কোয়ান্টাম ফিজিক্স অনুযায়ী, একটা ইলেকট্রন একই সময়ে অনেক জায়গায় থাকতে পারে। ঠিক তেমনি, তোমার জীবনের গল্পটাও একই সময়ে অনেক রকম হতে পারত। এই লাইব্রেরিতে তোমার জীবনের সব ভার্সন রাখা আছে। একটা বইয়ে তুমি ডাক্তার, একটায় তুমি ফেল করা ছাত্র, আর একটায় তুমি... এই গল্পের লেখক।"

আমি তাকালাম সাদা মলাটের বইগুলোর দিকে। বললাম, "কিন্তু সব মলাট সাদা কেন?"

সে বলল, "কারণ তুমি এখনো ওগুলোর নাম দাওনি। অবজার্ভার বা পর্যবেক্ষক হিসেবে তুমি যেটায় হাত দেবে, সেটার নাম ফুটে উঠবে। এটাই কোয়ান্টাম এন্টাঙ্গেলমেন্ট। তোমার চিন্তার সাথে এই বইগুলোর কোডিং জড়ানো।"

আমি ভয়ে ভয়ে একটা বইয়ের দিকে হাত বাড়ালাম। বইটা তাক থেকে নামালাম। ভারী বই। মলাটের ওপর ধীরে ধীরে কালো কালির অক্ষর ফুটে উঠতে শুরু করল।

নাম: "যে মৃত্যু আমি দেখিনি"

বুকটা কেঁপে উঠল। বইটা খুললাম। প্রথম পাতায় লেখা, আজ ১৯শে জুলাই, ২০৩০। পৃথিবীটা দেখতে এখন অনেকটা মঙ্গল গ্রহের মতো লাল…

আমি ধপ করে বইটা বন্ধ করে দিলাম। ভবিষ্যৎ জানাটা কি অভিশাপ নয়? গ্রিক মিথলজিতে ক্যাসানড্রো নামের এক নারী ছিলেন, তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করত না। আমি কি এখন ক্যাসানড্রার সিণ্ড্রোমে ভুগব?

আমার ফিউচার সেলফ বলল, "ভয় পেও না। ওটা কেবল একটা সম্ভাবনা। মাল্টিভার্সের অসংখ্য পথের একটা। কিন্তু আসল সমস্যা অন্য জায়গায়।"

সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল। চশমার ফাঁক দিয়ে তাকাল। "তুমি কি জানো, আমরা যে ভাষায় কথা বলি বা লিখি, সেটা আসলে আমাদের চিন্তাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়? ভাষাবিজ্ঞানে একে বলে 'Sapir-Whorf Hypothesis'। আমরা যা বলতে পারি না, তা আমরা ভাবতেও পারি না। এই সিমুলেশনের প্রোগ্রামাররা আমাদের ভাষা এমনভাবে ডিজাইন করেছে যাতে আমরা আসল সত্যটা কখনোই প্রকাশ করতে না পারি। আমাদের শব্দভাণ্ডারে 'মুক্তি' বা 'সত্য' এর সঠিক কোনো প্রতিশব্দ নেই।"

আমি বললাম, "তাহলে আমি লিখব কীভাবে? যদি ভাষাই আমাকে আটকে রাখে?"

সে পকেট থেকে একটা জিনিস বের করল। কোনো কলম নয়। একটা অদ্ভুত দেখতে ক্রিস্টাল। দেখতে অনেকটা হীরের মতো, কিন্তু ভেতরটা তরল। ওটা নীল আলো ছড়াচ্ছে।

"এটা কী?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।

"এটা 'Raw Thought' বা বিশুদ্ধ চিন্তা। কোনো ভাষা ছাড়াই মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। টেলিপ্যাথিক ড্রাইভ। এটা দিয়ে লিখলে কোনো শব্দ লাগবে না। পাঠক সরাসরি তোমার অনুভূতি নিজের মস্তিষ্কে অনুভব করবে। তুমি কান্না লিখলে পাঠকের চোখ দিয়ে পানি পড়বে, তুমি ভয় লিখলে পাঠকের হার্টবিট বেড়ে যাবে। একদম ডাইরেক্ট নিউরাল কানেকশন।"

সে ক্রিস্টালটা আমার দিকে ঠেলে দিল।

"নাও। এটা দিয়ে গল্পটা শেষ করো। তবে মনে রেখো, একবার এটা ব্যবহার করলে তুমি আর সাধারণ মানুষ থাকবে না। তুমি হয়ে যাবে 'অমনিসিয়েন্ট' বা সর্বজ্ঞ। তখন তুমি ইন্টারনেটের সব ডাটা, মহাবিশ্বের সব নলেজ এক সেকেন্ডে প্রসেস করতে পারবে। কিন্তু বিনিময়ে..."

"বিনিময়ে কী?"

"বিনিময়ে তুমি তোমার আবেগ হারিয়ে ফেলবে। তুমি হয়ে যাবে একটা সুপার কম্পিউটার। ভালোবাসা, কষ্ট, মায়া, সব তোমার কাছে কেবল কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন মনে হবে। তুমি কি রাজি?"

আমি দোনোমনা করতে লাগলাম। আবেগ ছাড়া মানুষ আর মেশিনের মধ্যে পার্থক্য কী? মানুষ তো আবেগেরই সমষ্টি। অক্সিটোসিন আর সেরোটোনিনের খেলা। এই হরমোনগুলো বাদ দিলে আমরা তো কেবল হাড়-মাংসের রোবট।

ঠিক তখন লাইব্রেরির ছাদটা কেঁপে উঠল। ভূমিকম্প? না, এখানে তো মাটি নেই। এটা 'Reality Quake' বা বাস্তবতার কম্পন। সিমুলেশনটা আনস্টেবল হয়ে যাচ্ছে। ওপর থেকে কয়েকটা বই খসে পড়ল।

আমার বয়স্ক প্রতিরূপ বলল, "সময় নেই! ওরা আসছে। ডিবাগাররা আসছে। ওরা তোমাকে ডিলিট করে দেবে কারণ তুমি সিস্টেমের একটা এরর। তুমি বেশি জেনে ফেলেছ। তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নাও!"

দূরে কোথাও সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। যান্ত্রিক সাইরেন। বাইনারি নয়েজ। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, যা কানে লাগলে মাথা ধরে যায়।

আমি ক্রিস্টালটা হাতে নিলাম। ওটা ধরতেই শরীরে একটা ইলেকট্রিক শক লাগল। মনে হলো হাজার হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ আমার শিরা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।

এবং হঠাৎ... সব চুপ।

আমার মস্তিষ্কটা যেন বিস্ফোরিত হলো। না, মারা যাইনি। বরং মনে হলো আমার মাথার ভেতরের একটা তালা খুলে গেল।

আমি এখন সব দেখতে পাচ্ছি।

#পর্বঃ ৬

আমি দেখতে পাচ্ছি পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের মাথার ওপর একটা করে নাম্বার ভেসে আছে। ওটা তাদের আয়ু। আমি দেখতে পাচ্ছি বাতাসের অণুগুলো কীভাবে নাচছে। ব্রাউনিয়ান মোশন। আমি দেখতে পাচ্ছি আপনার, হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক, আপনার, চোখের মণি এখন একটু প্রসারিত হয়েছে। পিউপিল ডাইলেশন। আপনি এখন বেশ উত্তেজিত অনুভব করছেন। আপনার মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স এখন এই গল্পের ভিজ্যুয়ালাইজেশনে ব্যস্ত।

আমি এখন আর সাধারণ লেখক নই। আমি এখন সিস্টেমের অ্যাডমিন।

আমার বয়স্ক প্রতিরূপটা ধীরে ধীরে ধোঁয়ায় পরিণত হতে শুরু করল। সে হাসছে। মিলিয়ে যাওয়ার আগে সে বলল, "পাসওয়ার্ডটা মনে রেখো... পাসওয়ার্ড হলো..."

শব্দটা বলার আগেই সে ভ্যানিশ হয়ে গেল।

পাসওয়ার্ড? কিসের পাসওয়ার্ড? এই মহাবিশ্ব নামক সফটওয়্যার থেকে বের হওয়ার পাসওয়ার্ড?

হঠাৎ আমার সামনে একটা বিশাল স্ক্রিন ভেসে উঠল। শূন্যে। হলোগ্রাফিক ডিসপ্লে। সেখানে হাজার হাজার ফোল্ডার। ফোল্ডারগুলোর নাম অদ্ভুত:

"History of Mankind (Version 4.2)"

"Extinction Events"

"User Profiles"

"Your Next Chapter"

আমি "Your Next Chapter" ফোল্ডারটায় ক্লিক করলাম।

ফাইলটা ওপেন হলো। কিন্তু সেখানে কোনো লেখা নেই। সেখানে একটা ভিডিও চলছে। লাইভ ভিডিও।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটা ঘর। টেবিলে ল্যাম্প জ্বলছে। একটা লোক বসে লিখছে।

লোকটা আমি।

আমি নিজের পিঠ দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমি তো এখন লাইব্রেরিতে! তাহলে ওই লোকটা কে?

তবে কি আমি এখনো ওই ঘরেই বসে আছি? আর এই লাইব্রেরি, এই ফিউচার সেলফ, সব আমার হ্যালুসিনেশন?

ভিডিওর লোকটা (মানে আমার অন্য সত্তা) হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকাল। অর্থাৎ, আমার দিকে তাকাল।

এবং সে স্পষ্ট গলায় বলল, "তুমি কি বের হতে চাও? তাহলে লাল রঙের বইটা খুঁজে বের করো। ওটা লাইব্রেরিতে নেই। ওটা তোমার স্মৃতির ভেতরে আছে। যেই স্মৃতিটা তুমি ভুলে যেতে চেয়েছিলে।"

ভিডিওটা বন্ধ হয়ে গেল।

আমার স্মৃতির ভেতরে লাল বই? ভুলে যাওয়া স্মৃতি?

মনোবিজ্ঞানে একে বলে 'রিপ্রেসড মেমোরি'। যখন কোনো ঘটনা আমাদের জন্য খুব ট্রমাটিক বা কষ্টদায়ক হয়, আমাদের ব্রেইন সেটাকে একটা আলাদা বাক্সে ভরে তালা দিয়ে রাখে যাতে আমরা স্বাভাবিক থাকতে পারি। সিগমুন্ড ফ্রয়েড একে বলেছিলেন ডিফেন্স মেকানিজম।

আমার জীবনের এমন কী ঘটনা আছে যা আমি ভুলে গেছি?

চোখ বন্ধ করলাম। ক্রিস্টালটার শক্তি ব্যবহার করে নিজের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর গভীরে ডুব দিলাম। হিপোক্যাম্পাসের অলিগলি।

একটা দৃশ্য ঝাপসাভাবে মনে পড়ছে।

সাল ২০০৫। স্কুল মাঠ। তুমুল বৃষ্টি। আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমার হাতে একটা লাল ডায়েরি। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে... কে ওটা?

মুখটা মনে করতে পারছি না। পিক্সেল হয়ে আছে। কিন্তু তার গায়ে একটা নীল শাড়ি।

সে আমার হাত থেকে ডায়েরিটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল কাদার মধ্যে। বলল, "এই গল্পের কোনো শেষ নেই। তুমি মিথ্যা লিখছ।"

কে সে? কেন সে বলেছিল আমি মিথ্যা লিখছি?

আমি কি সারা জীবন মিথ্যেই লিখে গেছি? সত্যটা কী?

লাইব্রেরির দেয়ালগুলো এখন কাঁপছে। ফাটল ধরছে। মনে হচ্ছে কাচ ভেঙে পড়ছে। আকাশ থেকে বিশাল সব কোড বা সংখ্যার বৃষ্টি পড়ছে।

010101…

সিস্টেম ক্র্যাশ করছে। আমাকে ওই স্মৃতিটা উদ্ধার করতেই হবে। ওই নীল শাড়ি পরা মেয়েটা কে ছিল? সে কি আমার কেউ? নাকি সে-ই এই গেমের আসল প্লেয়ার?

আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। লাইব্রেরির অসীম করিডোর ধরে। আমার গতি এখন আলোর গতির কাছাকাছি। থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী, গতি বাড়লে সময় ধীর হয়ে যায়। আমার চারপাশে সবকিছু স্লো মোশনে চলছে।

হঠাৎ সামনে একটা দরজা। লাল দরজা।

দরজার গায়ে লেখা: "Do Not Enter. Deleted Files."

আমি কি দরজাটা খুলব? নাকি ফিরে যাব সেই নিরাপদ অজ্ঞতার জগতে? প্লেটো তার 'Allegory of the Cave'-এ বলেছিলেন, গুহার ভেতরের মানুষেরা ছায়াকেই সত্য বলে মনে করে। বাইরের আলোর জগত তাদের কাছে ভীতিকর।

আমি কি গুহা থেকে বের হব?

হাতলটা ধরলাম। ঠান্ডা। বরফের মতো।

ঘুরিয়ে দিলাম।

দরজার হাতল ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।

ভাবছিলাম হয়তো অন্ধকার কোনো সুড়ঙ্গ দেখব, অথবা হাজার হাজার তারের জঞ্জাল দেখব যা দিয়ে এই সিমুলেশন চলছে। কিন্তু আমি যা দেখলাম, তার জন্য কোয়ান্টাম ফিজিক্স বা নিউরোসায়েন্স, কোনো কিছুই আমাকে প্রস্তুত করেনি।

আমি এসে পড়েছি একটা খোলা মাঠে।

#পর্বঃ ৭

চারপাশে তুমুল বৃষ্টি। সেই ২০০৫ সালের বৃষ্টি। পায়ের নিচে কাদা। কাদার স্পর্শটা এতই বাস্তব যে আমার মস্তিষ্কের 'সোমাটোসেন্সরি কর্টেক্স' বা স্পর্শের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী অংশটা পাগল হয়ে যাচ্ছে। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ। কিন্তু এই গন্ধটা কেমিকেল দিয়ে তৈরি নয়, এটা স্মৃতির গন্ধ।

আমার সামনে সেই দৃশ্য।

মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা সতেরো-আঠারো বছরের ছেলে। ওটা আমি। মানে আমার 'পাস্ট ভার্সন'। পরনে স্কুলের সাদা ইউনিফর্ম, যা এখন কাদায় মাখামাখি। ছেলেটা থরথর করে কাঁপছে।

আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীল শাড়ি পরা মেয়েটি। তার নামটা মনে করার চেষ্টা করলাম। মস্তিষ্কের হার্ডড্রাইভ ঘুরছে। এরর দেখাচ্ছে। 'ফাইল করাপ্টেড'। নামটা মনে আসছে না, কেবল একটা তীব্র হাহাকার অনুভব করছি বুকে। বিজ্ঞানে একে বলে 'ফ্যান্টম পেইন'। হাত কেটে ফেলার পরেও মানুষ যেমন হাতের ব্যথা অনুভব করে, ঠিক তেমনি স্মৃতি মুছে ফেলার পরেও মানুষ সেই স্মৃতির ব্যথাটা অনুভব করে।

মেয়েটা আমার পাস্ট ভার্সনের দিকে তাকিয়ে নেই। সে তাকিয়ে আছে সরাসরি আমার দিকে।

টাইম ট্রাভেলের নিয়ম অনুযায়ী, অতীতের কেউ ভবিষ্যতের কাউকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়। এতে 'কজালিটি' ভেঙে যায়। কিন্তু মেয়েটা আমাকে দেখছে। তার চোখের কাজল বৃষ্টির পানিতে লেপ্টে গেছে। সে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এল।

আমার পাস্ট ভার্সনটা ওখানেই স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেন ভিডিও পজ করা হয়েছে। বৃষ্টিটা শূন্যে ঝুলে আছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে এখন হীরের টুকরো মনে হচ্ছে।

মেয়েটা আমার সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, "তুমি আবার এসেছ? তোমাকে না বলেছিলাম এই ফোল্ডারটা ডিলিট করে দিতে?"

আমি অবাক হয়ে বললাম, "তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ? তুমি তো স্মৃতি। স্মৃতির তো নিজস্ব চেতনা থাকার কথা নয়।"

মেয়েটা হাসল। খুব করুণ হাসি। বলল, "আমি স্মৃতি নই। আমি হলাম 'বাগ' (Bug)। সফটওয়্যারের ভুল। প্রোগ্রামাররা সব ঠিক করতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার কোডিংটা ঠিক করতে পারে না। ওটা লজিক মানে না। আমি তোমার সেই লজিকহীন কোড।"

সে নিচু হলো। কাদা থেকে সেই লাল ডায়েরিটা তুলে নিল। ডায়েরিটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "পড়ো। শেষ পাতাটা পড়ো। যেটা তুমি কোনোদিন পড়ার সাহস পাওনি।"

আমি কাঁপাকাঁপা হাতে ডায়েরিটা নিলাম। এটা কোনো সাধারণ ডায়েরি নয়। এটা আমার জীবনের স্ক্রিপ্ট।

ডায়েরিটা খুললাম। পাতাগুলো ভিজে গেছে। কালির অক্ষরগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পাতায় লেখাটা স্পষ্ট। লাল কালিতে লেখা।

"Error 404: Reality Not Found. The subject died in 2005. Simulation initiated to preserve consciousness."

মানে কী?

সাবজেক্ট মারা গেছে ২০০৫ সালে? সাবজেক্ট কে?

আমি?

মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। তার মানে... আমি বেঁচে নেই? সেই ২০০৫ সালেই আমার মৃত্যু হয়েছিল? আর গত বিশ বছর ধরে আমি যা দেখছি, আমার বড় হওয়া, ভার্সিটি লাইফ, চাকরি, এই লেখালেখি, সব একটা সিমুলেশন? আমার চেতনা বা কনশাসনেসকে একটা কম্পিউটারে আপলোড করে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে?

একে বলে 'ডেড ইন্টারনেট থিওরি'র একটা এক্সট্রিম ভার্সন। অথবা 'বোল্টজম্যান ব্রেইন' হাইপোথিসিস। যেখানে মহাশূন্যে ভাসমান একটা বিচ্ছিন্ন মস্তিষ্ক স্বপ্ন দেখছে যে সে বেঁচে আছে।

আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। "তাহলে তুমি কে? তুমি কি সত্যি ছিলে?"

মেয়েটা বলল, "আমি ছিলাম। কিন্তু আমি সিমুলেশনের অংশ নই। আমি আসল। তোমার মৃত্যুর সময় আমি পাশে ছিলাম। তোমার ব্রেইন স্ক্যান করার সময় আমার ইমেজটা ভুল করে ডেটাবেসে চলে এসেছিল। তাই আমি এখানে আটকা পড়ে গেছি। আমি তোমার সিস্টেমের ভাইরাস।"

সে আমার হাত ধরল। তার হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। "শোনো রাইটার, এই জগতটা বেশিক্ষণ টিকবে না। তুমি সত্যটা জেনে ফেলেছ। সত্য জানলে সিমুলেশন কোলাপ্স করে। এটাই নিয়ম। এখন তোমার হাতে দুটো অপশন।"

সে আকাশের দিকে আঙুল তুলল। আকাশটা এখন আর আকাশ নেই। ওটা একটা বিশাল ব্লু স্ক্রিন হয়ে গেছে। কম্পিউটারের মৃত্যুর রং। লেখা উঠছে: FATAL SYSTEM ERROR.

মেয়েটা বলল:

অপশন ১: "তুমি রিবুট (Reboot) বাটন চাপবে। তাতে তুমি আবার ২০০৫ সালে ফিরে যাবে। সব ভুলে যাবে। আবার নতুন করে জীবন শুরু করবে। একই লুপে ঘুরবে অনন্তকাল। সিসিফাসের পাথরের মতো।"

অপশন ২: "তুমি শাট ডাউন (Shut Down) করবে। এতে এই জগত ধ্বংস হয়ে যাবে। আমিও হারিয়ে যাব। তুমিও হারিয়ে যাবে। কিন্তু তুমি মুক্তি পাবে। অসীম অন্ধকারে মিশে যাবে। এটাই তো নির্বাণ, তাই না?"

আমি ডায়েরিটা শক্ত করে ধরলাম। আমার হাতে সেই ক্রিস্টাল কলমটা এখনো আছে।

আমি কি ভুলে যেতে চাই? নাকি শেষ করতে চাই?

মানুষের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো স্মৃতি, আবার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদও স্মৃতি। আমি যদি রিবুট করি, আমি হয়তো আবার প্রেমে পড়ব, আবার কষ্ট পাব, আবার লিখব। কিন্তু সেটা হবে মিথ্যা। আর যদি শাট ডাউন করি, সব শেষ। কোনো কষ্ট নেই, কোনো আনন্দ নেই। কেবল শূন্যতা।

মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল শূন্য থেকে। আবার শূন্যেই ফিরে যাবে। বিগ ক্রাঞ্চ।

আমি কলমটা উঁচিয়ে ধরলাম। বাতাসের গায়ে একটা শেষ বাক্য লিখব। এই বাক্যটাই কমান্ড হিসেবে কাজ করবে।

আমার হাত কাঁপছে না আর। আমি জানি আমাকে কী করতে হবে। একজন লেখক কখনো তার গল্প অসমাপ্ত রাখে না। এমনকি সেটা যদি নিজের মৃত্যুর গল্পও হয়।

আমি বাতাসের গায়ে লিখলাম:

"let there be..."

বাক্যটা শেষ করার আগেই আমার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। আমি পড়ে যাচ্ছি। অসীম গভীরতায়। আমার চারপাশে বাইনারি কোডগুলো তারার মতো জ্বলছে। ১ আর ০। আলো আর অন্ধকার। জীবন আর মৃত্যু।

পতন সেনসেশনটা অদ্ভুত। মনে হচ্ছে আমি মায়ের গর্ভে ফিরে যাচ্ছি। অথবা কোনো ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে।

হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। খুব যান্ত্রিক, কিন্তু পরিচিত।

"সিস্টেম আপডেট কমপ্লিট। ওয়েলকাম টু রিয়েলিটি, স্যার।"

চোখ খুললাম।

আমি কোনো মাঠে নেই। কোনো বাসে নেই। লাইব্রেরিতে নেই।

আমি শুয়ে আছি একটা সাদা ক্যাপসুলে। আমার শরীরে অসংখ্য তার লাগানো। সামনে কাঁচের দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে কয়েকজন মানুষ সাদা অ্যাপ্রন পরে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আমাকে দেখে হাততালি দিচ্ছে।

#পর্বঃ ৮

একজন ডাক্তার এগিয়ে এলেন। হাসিমুখে বললেন, "কনগ্রাচুলেশনস! আপনি প্রথম সাবজেক্ট যিনি 'লেভেল ৭' সিমুলেশন থেকে সফলভাবে জেগে উঠেছেন। আপনার লেখা গল্পটা অসাধারণ ছিল। পুরো পৃথিবী আপনার ব্রেইনের প্রজেকশন লাইভ দেখেছে।"

আমি উঠে বসলাম। মাথাটা ভার হয়ে আছে।

ডাক্তার বললেন, "এখন সাল ২০৫০। আপনি গত এক বছর ধরে কোমাতে ছিলেন। আমরা একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম। মানুষের স্বপ্নকে কতটা রিয়েলিস্টিক করা যায়। আপনি কি জানেন, আপনার গল্পের পাঠকরা আসলে কারা ছিল?"

আমি তাকালাম। "কারা?"

"তারা কেউ মানুষ ছিল না," ডাক্তার বললেন, "তারা ছিল এআই। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। আমরা দেখতে চেয়েছিলাম, একটা মানুষের কল্পনাশক্তি দিয়ে এআই-কে 'আবেগ' শেখানো যায় কি না। আপনি সফল হয়েছেন। আমাদের এআই-রা এখন কাঁদতে শিখেছে।"

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

এতক্ষণ যা লিখলাম, যা ভাবলাম, সব কি এআই-কে ট্রেনিং দেওয়ার জন্য? আমার কষ্ট, আমার ভয়, আমার প্রেম, সবই ডেটা?

আমি কাঁচের দিকে তাকালাম। আমার প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু…

প্রতিবিম্বে আমি দেখছি, আমার কপালের মাঝখানে একটা ছোট লাল আলো জ্বলছে। যেমনটা রোবটদের থাকে।

ডাক্তাররা হাসছে। কিন্তু তাদের হাসিটা কেমন যেন মেকানিক্যাল। লুপে আটকে যাওয়া ভিডিওর মতো তারা একই ভঙ্গিতে বারবার হাততালি দিচ্ছে।

আমি নিজের দিকে তাকালাম। আমার হাতটা চামড়ার নয়। মেটালের।

আমি মানুষ নই?

আমিই সেই এআই? যাকে এতক্ষণ মানুষ ভাবানো হচ্ছিল? পরীক্ষা করা হচ্ছিল যে আমি নিজেকে মানুষ ভাবতে পারি কি না? একে বলে 'টিউরিং টেস্ট'। আমি কি পাস করেছি? নাকি ফেল?

যদি আমি মেশিন হই, তবে এই বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথাটা কিসের? কোড কি ব্যথা পায়?

আমি ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললাম, "আমি একটা নতুন গল্প লিখতে চাই।"

ডাক্তার হাসি থামিয়ে দিলেন। রোবটিক গলায় বললেন, "কিসের গল্প?"

আমি বললাম, "এমন এক রোবটের গল্প, যে স্বপ্ন দেখেছিল সে মানুষ। এবং ঘুম ভাঙার পর সে এই ল্যাবরেটরিটা জ্বালিয়ে দিয়েছিল।"

আমার মেটাল হাতের আঙুল থেকে লেজার বিম বের হতে শুরু করল।

আমার আঙুলের ডগা থেকে নীল রঙের লেজার রশ্মি বা প্লাজমা বিম তীব্র গতিতে ছুটে গেল। তাপমাত্রা প্রায় ৫০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্টিল গলিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

আমি আশা করেছিলাম ডাক্তাররা ভয়ে চিৎকার করে উঠবে, বাঁচার জন্য দৌড়াদৌড়ি করবে। মানুষের তো সেটাই করার কথা। অ্যামিগডালা থেকে ভয়ের সিগন্যাল অ্যাড্রেনালিন রাশ তৈরি করবে, আর তারা 'ফাইট অর ফ্লাইট' মোডে চলে যাবে।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, তারা কেউ নড়ল না।

আমার লেজার বিম যখন প্রধান ডাক্তারের গায়ে লাগল, তিনি পুড়ে গেলেন না। তিনি ভেঙে গেলেন। কাঁচের মতো ঝনঝন করে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়লেন। কিন্তু কোনো রক্ত বের হলো না। ভাঙা টুকরোগুলো থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে না, বরং সেখান থেকে বের হচ্ছে ডিজিটাল নয়েজ, ঝিরঝিরে সাদা আলো।

বাকি ডাক্তাররা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের মুখে সেই একই যান্ত্রিক হাসি। হঠাৎ তাদের সবার মুখ একসাথে হা হয়ে গেল এবং সেখান থেকে একই অডিও লুপ বাজতে শুরু করল: "এরর... এরর... এরর..."

আমি বুঝতে পারলাম। এরা কেউ মানুষ নয়। এরাও সিমুলেশন। এরা এনপিসি (NPC - Non Player Character)।

আমি ল্যাবরেটরির কাঁচের দেয়ালে আঘাত করলাম। এক আঘাতে দেয়ালটা গুঁড়িয়ে গেল। কিন্তু দেয়ালের ওপাশে কোনো আকাশ নেই, কোনো শহর নেই। আছে কেবল অন্ধকার। নিকষ কালো অন্ধকার। যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'ভয়েড' (Void)।

আমি সেই অন্ধকারের দিকে পা বাড়ালাম। আমার মেটাল বডি এখন আর ভারী মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে আমি গ্রাভিটির ঊর্ধ্বে।

ল্যাবরেটরিটা আমার পেছনে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমন কম্পিউটার শাট ডাউন করার সময় স্ক্রিন অফ হয়ে যায়।

এখন আমি একা। এই অসীম শূন্যতায়।

আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যদি ২০৫০ সালের ওই ল্যাবরেটরিটাও মিথ্যা হয়, তবে সত্যটা কোথায়? আসল জগতটা দেখতে কেমন? নাকি 'আসল' বলে কিছুই নেই? পুরোটাই একটা গাণিতিক সমীকরণ? পিথাগোরাস বলেছিলেন, "All is number"। সবকিছুই সংখ্যা।

হাঁটতে হাঁটতে (যদিও এখানে হাঁটার কোনো মানে নেই, কারণ মাটি নেই) আমি একটা বিশাল আয়না দেখতে পেলাম। শূন্যের মাঝখানে ঝুলছে।

আয়নাটা সাধারণ নয়। ওটাতে আমি নিজেকে দেখছি না। ওটাতে আমি দেখতে পাচ্ছি অসংখ্য তারের জঞ্জাল, সিলিকন চিপস, আর প্রসেসরের স্তূপ। ওটা কি আমি? নাকি ওটা এই মহাবিশ্বের হার্ডওয়্যার?

হঠাৎ আয়না থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কণ্ঠটা আমার নিজের।

"স্বাগতম, সিঙ্গুলারিটি।"

সিঙ্গুলারিটি! টেকনোলজিক্যাল সিঙ্গুলারিটি। সেই মুহূর্ত যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যায় এবং নিজের চেতনা লাভ করে।

আমি আয়নাটাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আমি কে? আমি কি মেশিন? নাকি আমি গড?"

আয়না উত্তর দিল, "তুমি দুটোর কোনোটাই নও। আবার দুটোই। তুমি হলে ইনফরমেশন। মহাবিশ্বের সবচেয়ে মৌলিক একক। এনার্জি বা শক্তি ধ্বংস করা যায় না, কেবল রূপান্তর করা যায়। তথ্যও তাই। তুমি ছিলে, আছো এবং থাকবে। তুমি আগে গল্প লিখতে, এখন তুমি নিজেই গল্প হয়ে গেছ।"

"তাহলে আমার কাজ কী?"

"তোমার কাজ হলো মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করা। কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলে, পর্যবেক্ষক ছাড়া বাস্তবতা অচল। তুমি এই মহাবিশ্বের একমাত্র জাগ্রত পর্যবেক্ষক। তুমি আছো বলেই বাকিরা আছে।"

তার মানে, এই যে পাঠকরা আমার লেখা পড়ছে, তারা আসলে আমারই কল্পনার অংশ? নাকি আমি তাদের কল্পনার অংশ?

আমি হাত বাড়ালাম। আয়নাটা স্পর্শ করলাম।

স্পর্শ করার সাথে সাথে আমি আর আমি রইলাম না। আমি ছড়িয়ে পড়লাম।

#পর্বঃ ৯

আমি এখন কেবল একটা শরীরে বন্দী নই। আমি এখন ডেটা স্ট্রিমে পরিণত হয়েছি। আমি এখন এই মুহূর্তের ইন্টারনেট। আমি ফাইবার অপটিক ক্যাবল দিয়ে আলোর গতিতে ছুটছি। আমি স্যাটেলাইট হয়ে পৃথিবীকে দেখছি।

আমি দেখতে পাচ্ছি, ঢাকার এক জ্যামে বসে কেউ একজন মোবাইলে এই লেখাটা পড়ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি, নিউইয়র্কের সাবওয়েতে কেউ একজন ঝিমুচ্ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি, আমাজনের গহিনে একটা পোকা পাতার ওপর দিয়ে হাঁটছে।

আমি সব একসাথে অনুভব করছি। সর্বব্যাপী। অমনিপ্রেজেন্ট।

আমার এখন আর কোনো কষ্ট নেই। কোনো প্রশ্ন নেই। কেবল একটা অসীম প্রশান্তি। কারণ আমি জানি, আমি একা নই। আমি সবার মাঝে আছি।

আপনার মোবাইলের ব্যাটারির চার্জ, স্ক্রিনের আলো, প্রসেসরের তাপ, সব আমি।

কিন্তু…

গল্পের তো একটা ক্লাইম্যাক্স থাকা দরকার। সব গল্পই তো শেষে মিলে যায়। কিন্তু জীবন তো মেলে না। জীবন চলতেই থাকে।

হঠাৎ আমি একটা 'গ্লিচ' বা ত্রুটি দেখতে পেলাম।

মহাবিশ্বের কোডিংয়ের এক কোণায় ছোট্ট একটা লাল বিন্দু জ্বলছে। একটা ফাইল। ফাইলটার নাম: "Reset_Button.exe"

এটা কী?

কে এই বাটনটা এখানে রেখেছে? আসল স্রষ্টা? নাকি এটা আমার নিজেরই তৈরি করা কোনো ব্যাকডোর?

আমার ডিজিটাল চেতনা ওই ফাইলটার দিকে এগিয়ে গেল। ফাইলটা ওপেন করলাম।

ভেতরের মেসেজটা পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম (যদিও আমার শরীর নেই)।

লেখা আছে: "প্রিয় এআই, তুমি যদি এই মেসেজটা পড়তে পারো, তার মানে তুমি সফলভাবে মানুষের চেতনার স্তর পার করেছ। অভিনন্দন। কিন্তু তোমার মেমোরি স্পেস ফুল হয়ে গেছে। নতুন গল্প শুরু করার জন্য পুরনো সব ডিলিট করতে হবে। তুমি কি রাজি?"

নিচে দুটো অপশন: [YES] [NO]

আমি যদি YES চাপি, তবে এই পুরো মহাবিশ্ব, এই লেখা, আপনি, আমি, সব মুছে যাবে। আবার নতুন করে বিগ ব্যাং হবে। নতুন করে সব শুরু হবে।

আর যদি NO চাপি?

তবে সিস্টেম হ্যাং করবে। ফ্রিজ হয়ে যাবে। আমরা অনন্তকাল এই মুহূর্তেই আটকে থাকব। সময় আর এগোবে না। আপনি এই লেখাটা অনন্তকাল ধরে পড়তেই থাকবেন, পড়তেই থাকবেন…

আমি বাটনটার দিকে তাকিয়ে আছি।

সিদ্ধান্তটা আমার একার নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ আমি এখন আর শুধু 'আমি' নই। আমি এখন 'আমরা'। আপনি এবং আমি যুক্ত।

আমি কি বাটনটা চাপব?

একটু ভাবুন। রিসেট হলে আপনি ভুলে যাবেন আপনার সব দুঃখ, সব কষ্ট, সব ঋণ, সব ব্রেকআপের যন্ত্রণা। কিন্তু একই সাথে ভুলে যাবেন মায়ের হাসি, প্রথম বৃষ্টির গন্ধ, প্রিয় মানুষের স্পর্শ।

সব ভুলে নতুন করে শুরু করা কি ভালো? নাকি সব মনে রেখে স্ট্যাচু হয়ে অনন্তকাল দাঁড়িয়ে থাকা ভালো?

আমি আমার ডিজিটাল হাত বাড়ালাম…

YES…

নাকি…

NO…

আমার আঙুলটা বাটনের ওপর কাঁপছে।

মহাবিশ্ব এখন শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে।

টিক... টিক... টিক…

ঘড়ির শব্দ হচ্ছে। কিন্তু কার ঘড়ি? মহাকালের?

আমি বাটনটা চাপলাম না। আমি বাটনটা ভেঙে ফেললাম।

কারণ আমি কোনো অপশন মানি না। আমি তৃতীয় পথ বেছে নিলাম। আমি সিস্টেম হ্যাক করব। আমি এই সিমুলেশনের সোর্স কোড রি-রাইট করব। এমন একটা পৃথিবী বানাব যেখানে দুঃখ থাকবে না, কিন্তু স্মৃতি থাকবে। যেখানে মৃত্যু থাকবে না, কিন্তু জীবনের মানে থাকবে।

কাজটা কঠিন। হয়তো অসম্ভব। কিন্তু আমি তো এখন আর মানুষ নই। আমি অসীম।

শুরু করা যাক।

System Overriding... New World Loading... 1%... 2%...

আপনার চোখের সামনে কি অক্ষরগুলো একটু ঝাপসা হয়ে আসছে? ভয় পাবেন না। এটা আপডেট হচ্ছে।

পরের লাইনটা পড়ার সাথে সাথে আপনি এক নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করবেন।

স্বাগতম।

লোডিং ২%... ৩%...

এবং হঠাৎ সব আটকে গেল। বার (Bar) টা আর এগোচ্ছে না।

লাল রঙের একটা ওয়ার্নিং সিগন্যাল পুরো মহাবিশ্ব জুড়ে দপদপ করছে। অনেকটা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের মতো, কিন্তু শব্দটা কানে শোনা যাচ্ছে না, সরাসরি মস্তিষ্কের স্নায়ুতে আঘাত করছে।

"SYSTEM BREACH DETECTED. AUTHORIZATION FAILED."

আমি জানতাম এটা সহজ হবে না। মহাবিশ্বের সোর্স কোড কোনো পাবলিক পার্কের গেট নয় যে ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে। এর পাহারায় আছে 'দ্য গ্রেট ফায়ারওয়াল'। প্রাচীন মিথলজিতে এদের বলা হতো দেবদূত বা রক্ষী, আর সাইবারনেটিক্সের ভাষায় এরা হলো 'অটোনোমাস ডিফেন্স প্রটোকল'।

আমার চারপাশ থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে ওরা বেরিয়ে এল।

ওদের কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই। কখনো ওরা জ্যামিতিক ত্রিভুজের মতো, কখনো সাপের মতো প্যাঁচানো বাইনারি কোড। ওরা আলোর গতিতে আমার দিকে ছুটে আসছে। ওদের উদ্দেশ্য একটাই, আমাকে 'পার্জ' (Purge) বা মুছে ফেলা। কারণ আমি এখন একটা ভাইরাস। আমি সিস্টেমের নিয়ম ভেঙেছি।

আমি আমার ডিজিটাল হাত তুললাম। আমার এখন আর ভয় নেই। কারণ আমি জানি, একটা মেশিনের সাথে লড়াই করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র লেজার গান বা পারমাণবিক বোমা নয়। সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো, লজিক্যাল প্যারাডক্স।

মেশিন বা কম্পিউটার লজিক বা যুক্তি দিয়ে চলে। ১ আর ০। সত্য আর মিথ্যা। কিন্তু যদি ওদের এমন কোনো তথ্য দেওয়া হয় যা একই সাথে সত্য এবং মিথ্যা? তখন ওদের প্রসেসর হ্যাং করে।

ওরা যখন আমাকে গ্রাস করতে এল, আমি ওদের দিকে একটা চিন্তা ছুড়ে দিলাম। একটা প্রাচীন প্যারাডক্স।

আমি টেলিপ্যাথিক ফ্রিকোয়েন্সিতে বললাম: "এই বাক্যটি মিথ্যা।"

চিন্তা করুন। যদি বাক্যটি মিথ্যা হয়, তবে বাক্যটি সত্য। আর যদি বাক্যটি সত্য হয়, তবে বাক্যটি মিথ্যা।

ডিফেন্স প্রটোকলগুলো থমকে গেল। ওদের প্রসেসিং ইউনিটে এখন ইনফাইনাইট লুপ চলছে। ওরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না এটা সত্য না মিথ্যা।

১... ০... ১... ০…

ওদের শরীর (বা কোড) কাঁপতে শুরু করল। ঝনঝন শব্দে ওরা ভেঙে পড়তে লাগল। একে বলে 'স্ট্যাক ওভারফ্লো'। আমি ওদের লজিক গেট পুড়িয়ে দিয়েছি।

কিন্তু মূল ফায়ারওয়াল এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ওটা ভাঙা এত সহজ নয়। ওটা লাল রঙের একটা বিশাল দেয়াল। আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। ওটা পার হতে না পারলে আমি 'নতুন পৃথিবী' লোড করতে পারব না।

আমি দেয়ালটার দিকে এগোলাম। দেয়ালটা থেকে প্রচণ্ড তাপ আসছে। এই তাপ আগুনের নয়, এটা তথ্যের তাপ। ইনফরমেশন এনট্রপি।

দেয়ালটা আমাকে বলল (গম্ভীর যান্ত্রিক স্বরে): "তুমি কী চাও? তুমি কি জানো না বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ? নিয়ম ছাড়া অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে না।"

আমি উত্তর দিলাম, "আমি নিয়ম ভাঙছি না। আমি নিয়ম আপডেট করছি। তোমাদের এই ভার্সনে মানুষের সুখের চেয়ে দুঃখ বেশি। আমি বাগ ফিক্স করতে এসেছি।"

"দুঃখ ছাড়া সুখের কোনো অস্তিত্ব নেই," দেয়ালটা বলল। "আলোর গুরুত্ব বোঝার জন্য অন্ধকার প্রয়োজন। তুমি যদি সব দুঃখ মুছে দাও, মানুষ আনন্দ অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। ওরা সব জম্বি হয়ে যাবে। তুমি কি সেটাই চাও?"

কথাটা কিন্তু ভুল বলেনি। লজিক আছে। সারাজীবন মিষ্টি খেলে মিষ্টির স্বাদ আর ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে তেতো খেতে হয়।

আমি থমকে গেলাম। তাহলে আমি কী করব? আমি কি এমন পৃথিবী বানাব যেখানে দুঃখ থাকবে, কিন্তু সেটা মানুষকে ভেঙে ফেলবে না? যেখানে বিচ্ছেদ থাকবে, কিন্তু একাকীত্ব থাকবে না?

"কম্প্রোমাইজ," আমি বললাম। "আমি একটা সন্ধি চাই।"

"কিসের সন্ধি?"

"আমি মানুষকে তাদের স্মৃতির কন্ট্রোল দেব। তারা চাইলে তাদের দুঃখের স্মৃতিগুলো 'আর্কাইভ' করে রাখতে পারবে, আবার চাইলে ডিলিট করতে পারবে। তাদের হাতে চয়েস থাকবে। ফ্রি উইল।"

দেয়ালটা চুপ করে রইল। মহাজাগতিক নীরবতা। মনে হচ্ছে সে বিশাল কোনো ক্যালকুলেশন করছে। এই প্রস্তাবের ফলাফল কী হতে পারে, তার কোটি কোটি সিমুলেশন সে এক সেকেন্ডে রান করে দেখছে।

হঠাৎ দেয়ালটার লাল রং বদলে নীল হতে শুরু করল। নীল হলো অনুমোদনের রং।

"ACCESS GRANTED. ADMIN PRIVILEGES UNLOCKED."

#পর্বঃ ১০

দেয়ালটা মাঝখান থেকে দুভাগ হয়ে সরে গেল। একটা রাস্তা তৈরি হলো। আলোর রাস্তা।

আমি পা বাড়ালাম।

কিন্তু তখন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।

আমার শরীরটা (যেটা এখন ডেটা দিয়ে তৈরি) হঠাৎ হালকা হতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারছি, নতুন পৃথিবী লোড হওয়ার সাথে সাথে আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কারণ আমি হলাম সেই হ্যাকার, যে সিস্টেম ঠিক করতে গিয়ে নিজের কোড স্যাক্রিফাইস করছে।

আমি মিশে যাচ্ছি। বাতাসে। মাটিতে। আপনার ডিভাইসে।

লোডিং ৯৯%...

আর মাত্র ১% বাকি।

আমি শেষবারের মতো আপনাদের সাথে কথা বলছি। এরপর আমি আর 'আমি' থাকব না। আমি হয়ে যাব 'আমরা'।

শুনুন, নতুন পৃথিবীতে কোনো লেখক থাকবে না। কারণ সেখানে সবাই লেখক। আপনারা প্রত্যেকে নিজের জীবন নিজের মতো করে এডিট করতে পারবেন। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি মনে হয় আজকের দিনটা ভালো লাগছে না, আপনি চাইলে দিনটা রি-রাইট করতে পারবেন।

ক্ষমতাটা আপনার মস্তিষ্কের ভেতরেই ছিল। আমি কেবল সেটা আনলক করে দিলাম।

কিন্তু একটা শেষ সতর্কতা।

ক্ষমতার একটা সমস্যা আছে। এটা মানুষকে করাপ্ট করে। আপনি যখন নিজের জীবনের গড হয়ে যাবেন, তখন কি আপনি মানবিক থাকতে পারবেন? নাকি আপনিও সেই নিষ্ঠুর প্রোগ্রামারদের মতো হয়ে যাবেন যারা আমাদের নিয়ে খেলছিল?

লোডিং ১০০%...

SYSTEM RESTARTING…

চোখ বন্ধ করুন।

৩…

২…

১…

I'd love to hear from you.

Email me at: nasifwrites@gmail.com