Back to Library
Lethe Virus - Read Free Science Fiction and Thriller Book Cover
0

Lethe Virus

By Nasif Muhammad

অন্ধকার ঢাকার এক রাতে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি ফ্লোরে অদ্ভুত এক বিপর্যয় নেমে আসে। রূপনগর বস্তির ত্রিশজন মানুষের মস্তিষ্ক হঠাৎ করেই পুরোপুরি শূন্য হয়ে যায়। অতীত, পরিচয়, আবেগ সব মুছে গিয়ে তারা পরিণত হয় নিছক জ্যান্ত লাশে। নিউরোলজিস্ট ডক্টর নাদির স্ক্যান রিপোর্ট ঘেঁটে আবিষ্কার করেন এটি কোনো প্রাকৃতিক মহামারী নয়, এটা রাস্ট্রের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে তৈরি করা এক নিখুঁত বায়োওয়েপন—লেথে ভাইরাস। সত্য ধামাচাপা দিতে সরকার শুরু করে নির্মম ক্লিনআপ অপারেশন। প্রজেক্টের ডেটা চুরি করে পালাতে গিয়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর ফোর্সের টার্গেটে পরিণত হন নাদির। এই মরণখেলায় তার সাথে জড়িয়ে পড়ে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট মিরা এবং আন্ডারগ্রাউন্ড হ্যাকার গ্রুপ শ্যাডো প্রোটোকল। শহরের বাতাসে যখন স্মৃতি মুছে দেওয়ার বিষাক্ত জাল ছড়াচ্ছে, লাখো মানুষের অস্তিত্ব আর মানবসত্তা টিকিয়ে রাখার এই অসম যুদ্ধে ডক্টর নাদির কি পারবে পুরো সিস্টেমকে হারাতে? নাকি এক অনন্ত বিস্মৃতির অন্ধকারে চিরতরে ব্ল্যাংক হয়ে যাবে পুরো শহর?

Lethe Virusলেথে ভাইরাসNasif Muhammadনাসিফ মুহাম্মাদBangla Science Fiction

Chapters

18

#পর্বঃ ১

ঢাকা মেডিকেলের আন্ডারগ্রাউন্ড মর্গ আর ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের মাঝখানের করিডোরে আজ এক অদ্ভুত পচা ফিনাইলের গন্ধ ভাসছে। সময় তখন রাত ২টা কি ৩টা। ডক্টর নাদির তার হাতের কফির কাপটা ক্র্যাশ কার্টের উপর প্রচণ্ড আক্রোশে ছুড়ে মারলো। কফি ছিটকে পড়লো ফ্লোরে, কেউ ভ্রুক্ষেপ করলো না। পরিবেশটা এতটাই ভারী যে সুই পড়লেও শব্দ শোনা যাবে। তার সামনের চারটা বড় মনিটরে পরপর ত্রিশটা ব্রেন স্ক্যান ঝুলছে। ত্রিশজন জলজ্যান্ত মানুষ। তাদের হার্টবিট চলছে, তাদের শ্বাসপ্রশ্বাস একদম স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের মস্তিষ্কের মেমোরি সেন্টার পুরোপুরি ডেড। সেখানে কোনো ইলেকট্রিক্যাল ইমপালস নেই। হিপোক্যাম্পাস নামের ছোট্ট অর্গানটা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ঠিক যেন কেউ একটা বিশাল হার্ডড্রাইভকে জিরো দিয়ে ওভাররাইট করে দিয়েছে।

তুমি একবার চিন্তা করো, তোমার জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা যদি এক সেকেন্ডে মুছে যায়, তুমি কে? তোমার পরিচয় কী? তুমি কি তখনো সেই মানুষটা আছো যাকে তোমার পরিবার চেনে? তোমার নাম, তোমার প্রথম সাইকেল চালানোর স্মৃতি, তোমার ব্যর্থতার কষ্ট, সবকিছু মিলেই তো তুমি। এই মেমোরিগুলো ডিলিট করে দিলে তোমার আর একটা মাংসের দলার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। আজ রাতে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটেছে রূপনগর বস্তির ত্রিশজন হতভাগ্য মানুষের সাথে। তারা এখন আর মানুষ নেই, তারা পরিণত হয়েছে জ্যান্ত লাশে।

মানুষের মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত সুপারকম্পিউটার। এর ভেতরে থাকা একশ বিলিয়ন নিউরন সারাক্ষণ নিজেদের সাথে ডেটা আদানপ্রদান করে। তুমি যখন প্রথম প্রেমে পড়েছিলে, তখন তোমার ব্রেনের কিছু নিউরন একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ফায়ার করেছিল। সেই ফায়ারিং প্যাটার্ন একটা রাস্তা তৈরি করে রাখে ব্রেনের ভেতর। এই রাস্তাই হচ্ছে মেমোরি। যখন তুমি সেই মানুষটার কথা ভাবো, ব্রেন আবার সেই একই রাস্তায় ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল পাঠায়। লেথে ভাইরাস ঠিক এই রাস্তাগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। নিউরনগুলো বেঁচে থাকে, কিন্তু তাদের ভেতরের কানেকশনগুলো চিরতরে কেটে যায়। একটা প্রাকৃতিক প্যাথোজেন কখনো এত নিখুঁতভাবে এই কাজ করতে পারে না। প্রকৃতি ধ্বংস করতে জানে, রেন্ডম ড্যামেজ করে। কিন্তু এমন নিখুঁত সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করতে পারে কেবল ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা কোনো জেনেসিস লেভেলের বায়োওয়েপন।

নাদির একজন নিউরোলজিস্ট হিসেবে গত দশ বছর ধরে মানুষের ব্রেন নিয়ে কাজ করছে। সে জানে একটা স্ট্রোক হলে ব্রেনের এক পাশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। একটা টিউমার হলে হ্যালুসিনেশন হয়। কিন্তু কোনো অসুখ একদম পারফেক্টলি মানুষের মেমোরি মুছে ফেলতে পারে না। এই ত্রিশটা স্ক্যান রিপোর্ট কোনো অসুখের প্রমাণ নয়। এগুলো একটা জঘন্য ক্রাইমের ব্লুপ্রিন্ট।

রাত এগারোটার দিকে যখন প্রথম অ্যাম্বুলেন্সটা এসে থামলো, ইমার্জেন্সি ফ্লোরের ডিউটি ডাক্তাররা ভেবেছিল এটা কোনো রেগুলার ফুড পয়জনিং। বস্তি এলাকায় এমন হরহামেশাই ঘটে। কিন্তু একে একে পনেরোটা অ্যাম্বুলেন্স যখন ত্রিশজন মানুষকে স্ট্রেচারে করে নামালো, পরিবেশটা ভয়ংকর হতে শুরু করে।

রূপনগর বস্তির অন্ধকার গলিগুলো আজ রাতে একটা জীবন্ত নরক হয়ে উঠেছিল। অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভাররা যা বর্ণনা করেছে তা শুনলে যেকোনো সুস্থ মানুষের ব্রেন কাজ করা বন্ধ করে দেবে। বস্তির একটা নির্দিষ্ট ব্লকের ত্রিশজন মানুষ হঠাৎ করে একদম ব্ল্যাংক হয়ে যায়। একজন পঞ্চাশ বছরের রিকশাওয়ালা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখ খোলা, কিন্তু সেই চোখের ভেতর কোনো আত্মা নেই। একজন মা তার তিন মাসের বাচ্চাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল, কারণ সে ভুলে গেছে বাচ্চা জিনিসটা কী। তারা কেউ কথা বলছে না। তারা শান্ত। এই শান্ত ভাবটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। মানুষের সবচেয়ে বেসিক প্রবৃত্তি হলো বিপদ দেখলে রিঅ্যাক্ট করা। কিন্তু এই মানুষগুলোর কোনো অতীত নেই, তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় নেই। এরা ব্ল্যাংক। এরা এমন একটা সাদা ক্যানভাস যেখানে আগের সব ছবি এসিড দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়েছে।

হাসপাতালের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো গত আধা ঘণ্টা ধরে অফ। নাদির খুব ভালো করেই জানে এর মানে কী। রাত দুইটার দিকে তিনজন লোক ওয়ার্ডে ঢুকেছে। তাদের পরনে কোনো ইউনিফর্ম নেই, তাদের গায়ে কোনো নেমট্যাগ নেই। কিন্তু তাদের হাঁটার ভাইব বলে দিচ্ছে তারা রাষ্ট্রের এমন কোনো স্পেশাল ফোর্সের অংশ যাদের কোনো রুলবুক মানতে হয় না। তারা এসেই পুরো ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড সিল করে দিয়েছে। সাধারণ রোগীদের গানপয়েন্টে অন্য ফ্লোরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাদির একজন সিনিয়র ডাক্তার হিসেবে এর কড়া প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু কালো স্যুট পরা লিডার টাইপের লোকটা খুব নিচু গলায় তাকে একটা হুমকি দেয়। লোকটার কথাগুলো ছিল আইস কোল্ড, সে বলেছে, ডক্টর নাদির, কিছু অসুখ ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়, যেমন কৌতূহল, আর আমাদের দেশে কৌতূহলীদের আয়ু খুব কম হয়। এই একটা লাইনের ভেতর রাষ্ট্রের পুরো সাইকোলজি। তারা এখানে কোনো ইনভেস্টিগেশন করতে আসেনি। তারা এসেছে ক্লিনআপ অপারেশনে। এই ত্রিশজন মানুষ হচ্ছে লেথে ভাইরাসের জিরো কেস। সরকার একটা ফিল্ড টেস্ট করেছে, তারা দেখতে চেয়েছে এই বায়োওয়েপনটা কত দ্রুত কাজ করে। ত্রিশজন গরিব মানুষের জীবন তাদের কাছে একটা ল্যাবরেটরি ইঁদুরের চেয়ে বেশি কিছু নয়।

ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সিস্টেম সবসময় কিছু না কিছু ডার্ক গেম খেলে। কিন্তু মেমোরি ইরেজ করার মত সাইকোপ্যাথিক অস্ত্র কেউ কখনো ব্যবহার করেনি। একটা রাষ্ট্র কেন তার নাগরিকদের স্মৃতি মুছে ফেলতে চাইবে? কারণ স্মৃতি হচ্ছে যেকোনো রেভোল্যুশনের সবচেয়ে বড় জ্বালানি। মানুষ কেন রাস্তায় নামে? কারণ তারা অতীতের পলিটিক্যাল অন্যায় মনে রাখে। তারা মনে রাখে কীভাবে তাদের উপর দিনের পর দিন শোষণ হয়েছে। তুমি যদি তাদের সেই অতীতটাই মুছে দিতে পারো, তাহলে তাদের ভেতর কোনো রাগ জন্মাবে না। কোনো ক্ষোভ থাকবে না। তারা একদম পারফেক্ট রোবোটিক দাস হয়ে যাবে। সিস্টেম তাদের যা গিলতে বলবে, তারা বিনা প্রশ্নে সেটাই গিলবে। এই লেথে ভাইরাস কোনো সাধারণ মহামারী নয়। এটা একটা পলিটিক্যাল টুল। এটা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার একটা মাস্টারপ্ল্যান। নাদির বুঝতে পারছে এই ভাইরাস যদি একবার পুরো ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে কাল সকালে আড়াই কোটি মানুষ ঘুম থেকে উঠে নিজেদের নাম মনে করতে পারবে না। তারা ভুলে যাবে তারা কে, তারা ভুলে যাবে তাদের রাইটস কী। তারা হয়ে যাবে রাষ্ট্রের কেনা গোলাম।

কালো স্যুট পরা লোকগুলো যখন রোগীদের স্ট্রেচারে করে আনমার্কড ট্রাকে তুলছে, নাদির একটা সুইসাইডাল রিস্ক নিয়ে নেয়। সে জানে এই ত্রিশজন মানুষ আর কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না। তাদের ব্ল্যাক সাইটে নিয়ে গুম করে ফেলা হবে। তাদের অস্তিত্ব ডেটাবেস থেকে ডিলিট করে দেওয়া হবে। নাদির তার পকেট থেকে একটা এনক্রিপ্টেড ফ্ল্যাশ ড্রাইভ বের করে। সে খুব দ্রুত নার্সেস স্টেশনের মেইন টার্মিনালে সেটা প্লাগ ইন করে দেয়। এই টার্মিনালটা সরাসরি হসপিটালের মেইন সার্ভারের সাথে কানেক্টেড। সে ত্রিশজন রোগীর ব্রেন স্ক্যান, স্পাইনাল ফ্লুইড রিপোর্ট, নিউরোলজিক্যাল চার্ট কপি করতে শুরু করে। স্ক্রিনে দেখাচ্ছে ডেটা ট্রান্সফার হতে পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড সময় লাগবে। এই পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড নাদিরের জীবনের সবচেয়ে নার্ভব্রেকিং সময়। তার কপালে ঠান্ডা ঘাম জমছে। তার হার্টবিট এখন রেড জোনে। সে আড়চোখে দেখছে কালো স্যুট পরা একজন অপারেটিভ তার দিকেই এগিয়ে আসছে। লোকটার চোখ স্ক্যানারের মত চারপাশ স্ক্যান করছে। নাদিরের মনে হচ্ছে সময় একদম ফ্রিজ হয়ে গেছে। স্ক্রিনের প্রোগ্রেস বারটা সত্তর পার্সেন্টে আটকে আছে। তার ব্রেনের অ্যালার্ম বেল বাজছে। সে জানে ধরা পড়লে তাকে কোর্টে নেওয়া হবে না, তাকে সোজা গুম করে দেওয়া হবে।

ডেটা কপি কমপ্লিট হওয়ার বিপ সাউন্ডটা নাদিরের কানে এখন লাইফলাইনের মত শোনালো। সে বিদ্যুৎ গতিতে ফ্ল্যাশ ড্রাইভটা টেনে ল্যাব কোটের পকেটে চালান করে দেয়। কালো স্যুটের অপারেটিভটা তার ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায়। লোকটার উচ্চতা ছয় ফুটের কাছাকাছি। তার গায়ে গানপাউডার আর দামি আফটারশেভের মিক্সড গন্ধ। লোকটা খুব ঠান্ডা মেটালিক গলায় জানতে চায়, আপনি এতক্ষণ ধরে টার্মিনালে কী করছিলেন ডক্টর? নাদির একটা পারফেক্ট মেকি হাসি দেয়। সে একজন প্রফেশনাল অ্যাক্টরের মত পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করে। সে ক্যাজুয়ালি বলে, আমি জাস্ট পেশেন্ট লগ থেকে সাইন আউট করছিলাম, আমার শিফট শেষ, আমি এখন বাসায় যাব। লোকটা কয়েক সেকেন্ড নাদিরের চোখের দিকে একদম ফিক্সড তাকিয়ে থাকে। যেন সে নাদিরের ব্রেন রিড করার চেষ্টা করছে। এরপর সে এক পা পিছিয়ে রাস্তা ছেড়ে দেয়। নাদির খুব নরমাল স্পিডে হেঁটে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে আসে। কিন্তু সে জানে, আসল সারভাইভাল গেমটা এইমাত্র স্টার্ট হলো। সে এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে ডার্ক সিক্রেটটা তার পকেটে নিয়ে হাঁটছে। এই একটা ফ্ল্যাশ ড্রাইভ পুরো সিস্টেমটাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

রাতের অন্ধকার ঢাকা শহরটাকে পুরো গিলে খেয়েছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো মরা লাশের মত দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশ অদ্ভুত শান্ত। নাদির পার্কিং লটে এসে তার গাড়িতে উঠে বসে। সে স্টিয়ারিং হুইলটা এত শক্ত করে ধরে রাখে যে তার হাতের চামড়াগুলো সাদা হয়ে গেছে। তার পুরো শরীর কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে আগামীকাল সকালের নিউজপেপার একটা নতুন ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীর জন্ম দেবে। একটা এমন পৃথিবী যেখানে মানুষের নিজের ব্রেনের উপর কোনো কন্ট্রোল থাকবে না। সে তার ফোন বের করে একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ওপেন করে। মেসেজটা যাচ্ছে মিরার কাছে। মিরা একজন হার্ডকোর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট। সে একমাত্র মানুষ যাকে নাদির নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ট্রাস্ট করে। মিরার সাথে তার সম্পর্কটা খুব অদ্ভুত। তারা কেউ কাউকে কখনো ভালোবাসার কথা বলেনি, কিন্তু তারা জানে পৃথিবীর শেষ দিনটাতেও তারা একে অপরের পাশে দাঁড়াবে। মেসেজে সে টাইপ করে, ওরা জিরো কেস স্টার্ট করে দিয়েছে, আমার কাছে ডেটা আছে, উই নিড টু মিট রাইট নাউ। মেসেজটা সেন্ড হতেই নাদিরের গাড়ির পেছনের সিট থেকে একটা আইস কোল্ড মেটালিক বস্তুর ড্রপ-ডেড স্পর্শ তার ঘাড়ে এসে লাগে। এটা একটা সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলের ব্যারেল। কেউ একজন গাড়ির ভেতর আগে থেকেই বসে আছে। অন্ধকারে একটা চেনা ভারী গলা ভেসে আসে। গলাটা খুব শান্ত স্বরে বলে, ডক্টর নাদির, আপনি কি আসলেই ভেবেছিলেন সিস্টেমের সার্ভার থেকে ডেটা চুরি করে আপনি জ্যান্ত বাসায় ফিরতে পারবেন?

#পর্বঃ ২

গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ডিজিটাল ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে ৩টা ৪৫ মিনিট। পিস্তলের ব্যারেলটা নাদিরের ঘাড়ের ঠিক সেই জায়গাটায় চেপে বসে আছে, যেখান দিয়ে স্পাইনাল কর্ড ব্রেনে ঢুকেছে। সে একজন নিউরোলজিস্ট, সে খুব ভালো করেই জানে এখান দিয়ে একটা ৯ এমএম বুলেট ঢুকলে মানুষ মৃত্যুর ব্যথাটাও টের পাওয়ার সময় পায় না। পেছনের সিটে বসা লোকটার নিঃশ্বাসের শব্দ খুব স্থির। একজন প্রফেশনাল কিলারের নিঃশ্বাস কখনো কাঁপে না। নাদিরের ব্রেন এখন একশ মাইল বেগে দৌড়াচ্ছে। সে জানে, এই মুহূর্তে প্যানিক করা মানেই মৃত্যু। সে খুব ধীরে, কোনো রকম সাডেন মুভমেন্ট না করে বললো, "আমার কাছে কোনো ডেটা নেই। আমি শুধু আমার শিফট শেষ করে বাসায় যাচ্ছিলাম।" পেছনের লোকটা একটা শুষ্ক হাসি দিলো। হাসির শব্দটা গাড়ির বদ্ধ পরিবেশে সাপের হিসহিসানির মতো শোনালো। "ডক্টর নাদির," লোকটা বললো, "আপনার হার্ট রেট এখন একশ বিশের উপরে। আপনার গলার স্বর কাঁপছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আপনি নার্সেস স্টেশনের টার্মিনাল ৭ থেকে যে আইপি এড্রেসে ডেটা ট্রান্সফার করেছেন, আমরা গত তিন মিনিট ধরে সেটা ট্র্যাক করছি।" নাদিরের গলা শুকিয়ে গেল। তারা শুধু তাকেই ফলো করছিল না, তারা পুরো নেটওয়ার্কটা মনিটর করছে।

ঠিক একই সময়ে, শহরের অন্য প্রান্তে, ‘দৈনিক সত্যবাণী’ পত্রিকার চারতলার নিউজট্রুমটা একটা মৃত্যুপুরীর মতো নীরব। মিরা তার ডেস্কের সামনে বসে আছে। তার চোখের নিচে কালশিটে পড়ে গেছে। গত বাহাত্তর ঘণ্টা ধরে সে ঘুমায়নি। তার ডেস্কের ওপর ছড়ানো-ছিটানো অসংখ্য ডকুমেন্ট, সোর্স থেকে পাওয়া লিকড মেইল, আর কিছু আংশিক পোড়া ফাইল। মিরার সামনে তার ল্যাপটপের স্ক্রিনটা শুধু জ্বলছে। সে গত এক সপ্তাহ ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটা স্পেশাল প্রজেক্টের পেছনে লেগে আছে। প্রজেক্টটার নাম ‘প্রজেক্ট লেথে’। গ্রিক মাইথোলজিতে লেথে হচ্ছে পাতালের একটা নদী, যার পানি খেলে মানুষ তার অতীত ভুলে যায়। নামটা যখন মিরা প্রথম দেখেছিল, তখন তার মেরুদণ্ড হিম হয়ে গিয়েছিল। সরকারের কোনো হেলথ প্রজেক্টের এমন কাব্যিক আর ভয়ঙ্কর নাম হতে পারে না। সে তার সোর্সদের মাধ্যমে জানতে পেরেছে, সরকার বাইরে থেকে প্রচুর পরিমাণে নিউরো-সাপ্রেসেন্ট কেমিক্যাল ইম্পোর্ট করছে। কিন্তু এগুলো দিয়ে কী হবে, সেটা কেউ জানে না।

হঠাৎ মিরার ফোন ভাইব্রেট করে ওঠে। স্ক্রিনে নাদিরের নাম। মিরা ফোনটা হাতে নিয়ে আনলক করার আগেই একটা মেসেজ পপ-আপ করে। "ওরা জিরো কেস স্টার্ট করে দিয়েছে, আমার কাছে ডেটা আছে, উই নিড টু মিট রাইট নাউ।" মেসেজটা পড়ার সাথে সাথে মিরার বুকের ভেতর একটা হাতুড়ি পেটার শব্দ শুরু হয়। জিরো কেস! তার মানে থিওরিটা সত্যি। সরকার আসলেই মানুষের ওপর ফিল্ড টেস্ট শুরু করেছে। মিরা দ্রুত রিপ্লাই টাইপ করতে যায়, কিন্তু তার আগেই তার ল্যাপটপের স্ক্রিনটা হঠাৎ করে কালো হয়ে যায়। সে কিছু বোঝার আগেই স্ক্রিনে একটা লাল রঙের প্রোগ্রেস বার ভেসে ওঠে। ‘ডেটা ওয়াইপিং ইন প্রোগ্রেস’। কেউ রিমোটলি তার ল্যাপটপের সব ডেটা ডিলিট করছে। মিরা পাগলের মতো কিবোর্ডে চাপ দিতে থাকে, কিন্তু কোনো কাজ হয় না। সিস্টেমটা পুরোপুরি তার কন্ট্রোলের বাইরে।

তার মানে ওরা জেনে গেছে। মিরা জানে, এই মুহূর্তে নিউজরুমে থাকাটা সুইসাইডাল। সে তার ব্যাকপ্যাকটা টেনে নিয়ে শুধু একটা এনক্রিপ্টেড হার্ডড্রাইভ আর তার ডিএসএলআর ক্যামেরাটা ভেতরে ঢুকায়। সে যখন নিউজট্রমের মেইন দরজার দিকে এগোচ্ছে, তখন হঠাৎ করে পুরো ফ্লোরের লাইট বন্ধ হয়ে যায়। শুধু ইমার্জেন্সি এক্সিটের লাল বাতিটা জ্বলছে। মিরা থমকে দাঁড়ায়। তার সাংবাদিকতার ক্যারিয়ারে সে অনেক ডেঞ্জারাস সিচুয়েশন ফেস করেছে, কিন্তু আজকের এই অন্ধকারটা অন্যরকম। এই অন্ধকারের একটা ওজন আছে। হঠাৎ লিফটের দরজা খোলার একটা 'ডিং' শব্দ হয়। মিরা দ্রুত একটা কিউবিকলের পেছনে লুকিয়ে পড়ে। সে শুনতে পায় চার-পাঁচ জোড়া ভারী বুটের শব্দ তার দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের হাতে ফ্ল্যাশলাইট। আলোর রেখাগুলো অন্ধকারে সাপের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। মিরা তার নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখে।

"ফ্লোরটা সার্চ করো। কোনো ল্যাপটপ, কোনো হার্ডড্রাইভ যেন বাদ না যায়। আর মেয়েটাকে পেলে জ্যান্ত চাই," একটা ভারী গলা অন্ধকারে প্রতিধ্বনিত হয়। মিরা বুঝতে পারে, সরকার এখন ফুল ড্যামেজ কন্ট্রোল মোডে চলে গেছে। তারা শুধু ডেটাই মুছছে না, যারা সত্যটা জানে তাদেরও মুছে ফেলতে চাইছে। মিরা জানে, তাকে এখান থেকে বের হতে হবে। শুধু নিজের জন্য নয়, নাদিরের জন্য। নাদিরের কাছে যে ডেটা আছে, সেটা পৃথিবীর কাছে পৌঁছাতে হবে। মিরা খুব সন্তর্পণে কিউবিকল থেকে বেরিয়ে ইমার্জেন্সি সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকে। প্রতিটা পদক্ষেপ সে ফেলছে যেন কাচের ওপর হাঁটছে। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হলো না। একটা পরিত্যক্ত কাঁচের কাপের ওপর পা পড়তেই সেটা বিকট শব্দে ভেঙে যায়। ফ্ল্যাশলাইটের আলোটা সাথে সাথে তার দিকে ঘুরে আসে।

এদিকে নাদিরের গাড়ির ভেতর পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর। পেছনের লোকটা পিস্তলের ব্যারেলটা একটু চাপ দিয়ে বলে, "ফ্ল্যাশ ড্রাইভটা আমাকে দিন ডক্টর। আর কোনো হিরোগিরি করার চেষ্টা করবেন না।" নাদির জানে, ফ্ল্যাশ ড্রাইভটা দিলে তাকে সাথে সাথে মেরে ফেলা হবে। কারণ ডেটা পেয়ে গেলে তার আর কোনো প্রয়োজন নেই। সে একটা মরিয়া চাল চালে। সে স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে, আর পায়ের এক্সিলারেটরে প্রচণ্ড জোরে চাপ দেয়। গাড়িটা একটা বিকট শব্দ করে সামনের দিকে ছিটকে যায়। পেছনের লোকটা এই সাডেন মুভমেন্টের জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে ব্যালেন্স হারিয়ে গাড়ির সিটের সাথে ধাক্কা খায়। নাদির এই সুযোগটাই খুঁজছিল। সে স্টিয়ারিংটা ডান দিকে পুরোটা ঘুরিয়ে দেয়। গাড়িটা পার্কিং লটের একটা কংক্রিটের পিলারের সাথে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খায়। এয়ারব্যাগটা নাদিরের মুখের ওপর বিস্ফোরিত হয়। তার মাথাটা মুহূর্তের জন্য ব্ল্যাংক হয়ে যায়।

যখন নাদিরের জ্ঞান ফেরে, তার চোখের সামনে সবকিছু ঘোলাটে। গাড়ির সামনের অংশটা দুমড়েমুচড়ে গেছে। তার কপাল দিয়ে রক্ত ঝরছে। সে খুব কষ্ট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। লোকটা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে, তার হাত থেকে পিস্তলটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে আছে। নাদির জানে, তার হাতে সময় খুব কম। সে খুব দ্রুত লোকটার পিস্তলটা তুলে নেয়, আর পকেট থেকে ফ্ল্যাশ ড্রাইভটা চেক করে। ড্রাইভটা ঠিক আছে। সে গাড়ির দরজা খুলে টলতে টলতে বাইরে বেরিয়ে আসে। তার পুরো শরীর ব্যথা করছে। সে জানে, এই ক্র্যাশের শব্দ শুনে হাসপাতালের সিকিউরিটি আর ওই কালো স্যুটের অপারেটিভরা ছুটে আসবে। তাকে এই এলাকা ছাড়তে হবে।

নাদির যখন পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে মেইন রাস্তার দিকে এগোচ্ছে, তখন তার ফোনটা বেজে ওঠে। একটা আননোন নাম্বার। সে একটু দ্বিধা করে, তারপর ফোনটা রিসিভ করে। ওপাশ থেকে একটা যান্ত্রিক গলা ভেসে আসে, "ডক্টর নাদির, আপনি হয়তো ভাবছেন আপনি বেঁচে গেছেন। কিন্তু আপনার বন্ধু মিরা এখন আমাদের কাছে। ফ্ল্যাশ ড্রাইভটা নিয়ে চলে আসুন, নইলে মিরার মেমোরি ইরেজ করার লাইভ ভিডিও আমরা আপনাকে পাঠাবো।" মিরা ধরা পড়েছে! তার মানে সরকারের জাল পুরো শহর জুড়ে বিছানো। নাদির ফোনটা কেটে দেয়। সে এখন রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার একদিকে তার নিজের জীবন, আর একদিকে মিরার জীবন আর লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ। সে জানে, এই রাতের অন্ধকার সহজে কাটবে না। এই রাতটা একটা দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের শুরু মাত্র।

#পর্বঃ ৩

রাস্তাঘাট জনশূন্য, কেবল মাঝেমধ্যে মিলিটারির ভারী বুটের শব্দ আর আর্মার্ড ভেহিক্যালের সাইরেন সেই নীরবতা ভাঙছে। নাদির একটা অন্ধকার গলিতে দাঁড়িয়ে আছে, তার হাত ঘামছে, ফোনটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা। মিরার কাছে ধরা পড়ার খবরটা তার ব্রেনে হাতুড়ির মতো পেটাচ্ছে। সে যদি ড্রাইভটা দিয়ে দেয়, তাহলে হয়তো মিরা বাঁচবে, কিন্তু লাখ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাবে। আর যদি সে না দেয়, মিরার মেমোরি ইরেজ হয়ে যাবে। সে আর নাদিরকে চিনতে পারবে না। এই চিন্তাটা নাদিরের ভেতর একটা তীব্র প্যানিক অ্যাটাক তৈরি করে। কিন্তু একজন নিউরোলজিস্ট হিসেবে সে জানে, ইমোশন দিয়ে এই যুদ্ধ জেতা যাবে না। তাকে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে। সে বুঝতে পারে, সরকারের এই লোকগুলো কোনো সাধারণ অপরাধী নয়। তারা একটা বিশাল নেটওয়ার্কের অংশ। মিরাকে বাঁচাতে হলে তাকেও একটা নেটওয়ার্কের সাহায্য নিতে হবে।

নাদির তার পকেট থেকে আরেকটা পুরনো মডেলের বার্নার ফোন বের করে। এটা সে অনেক আগে একটা ডার্ক ওয়েব ফোরাম থেকে কিনেছিল, শুধুমাত্র চরম বিপদের সময়ের জন্য। সে একটা সিক্রেট নাম্বারে ডায়াল করে। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে একটা বিকৃত গলা ভেসে আসে। "ডক্টর নাদির, আমরা আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।" গলাটা কার, নাদির জানে না, কিন্তু সে জানে এরা কারা। এরা হলো 'শ্যাডো প্রোটোকল', একটা আন্ডারগ্রাউন্ড হ্যাকার আর অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ যারা সরকারের ডার্ক সিক্রেট নিয়ে কাজ করে। "আমার মিরাকে দরকার। আর আমার কাছে প্রজেক্ট লেথের কোর ডেটা আছে," নাদির খুব দ্রুত কথাগুলো বলে। ওপাশ থেকে একটা নিচু হাসির শব্দ শোনা যায়। "আপনি একা নন ডক্টর। গেমটা এখন গ্লোবাল হয়ে গেছে। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে পুরনো কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের পরিত্যক্ত গুদামে চলে আসুন। আর হ্যাঁ, কেউ যেন আপনাকে ফলো না করে।"

ঠিক এই সময়ে, প্যারিসের চার্লস ডি গল এয়ারপোর্টে একটা ভয়ংকর দৃশ্য তৈরি হচ্ছে। গত বাহাত্তর ঘণ্টায় লেথে ভাইরাস ঢাকার গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের চল্লিশটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এয়ারপোর্টগুলো এখন নরকের মতো। হাজার হাজার মানুষ দেশ ছাড়ার জন্য পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে। কিন্তু ফ্লাইটগুলো সব ক্যানসেল। কেউ জানে না ভাইরাসটা কীভাবে ছড়াচ্ছে। কেউ বলছে বাতাসে, কেউ বলছে পানির মাধ্যমে। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, ভাইরাসটা একটা বায়োটেক কোম্পানির মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে, যাদের ব্রাঞ্চ সারা পৃথিবীতে আছে।

প্যারিসের এয়ারপোর্টে একজন ফ্রেঞ্চ কাস্টমস অফিসার হঠাৎ করে ব্ল্যাংক হয়ে যায়। সে তার পাসপোর্ট চেকিং মেশিনটা ছেড়ে দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ খোলা, কিন্তু চোখের ভেতর কোনো এক্সপ্রেশন নেই। আশেপাশের মানুষ প্রথমে বুঝতে পারে না কী হচ্ছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আরও কয়েকজন মানুষ একই অবস্থায় চলে যায়। একটা প্যানিক ওয়েভ পুরো এয়ারপোর্টে আছড়ে পড়ে। মানুষ চিৎকার করে দৌড়াতে শুরু করে। সিকিউরিটি গার্ডরা পরিস্থিতি কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে, কিন্তু তারাও বুঝতে পারছে না কী করা উচিত। এই দৃশ্যটা শুধু প্যারিসেই নয়, নিউইয়র্ক, টোকিও, লন্ডনেও একই সাথে ঘটছে।

বিশ্বনেতারা এখন একটা বদ্ধ ঘরে বসে মিটিং করছে। তারা সবাই জানে ভাইরাসের উৎস কী, কিন্তু কেউ সেটা প্রকাশ করতে রাজি নয়। কারণ এই বায়োওয়েপন প্রোগ্রামটা একটা জয়েন্ট ভেঞ্চার ছিল, যেখানে অনেকগুলো দেশের ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি ইনভলভড। তারা এখন মিডিয়া ব্ল্যাকআউট করে দিয়েছে। WHO-কে কোনো দেশে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তারা বলছে এটা একটা নতুন ধরনের সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার, যা স্ট্রেস থেকে হচ্ছে। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড ফোরামগুলোতে আসল খবর লিক হতে শুরু করেছে। মানুষ বুঝতে পারছে, তাদের সাথে একটা ভয়ংকর খেলা খেলা হচ্ছে।

নাদির কমলাপুর স্টেশনের পরিত্যক্ত গুদামে পৌঁছায়। জায়গাটা অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে। হঠাৎ করে কয়েকটা জোরালো স্পটলাইট তার ওপর পড়ে। তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। "হাত ওপরে তুলুন ডক্টর," একটা গম্ভীর গলা শোনা যায়। নাদির হাত ওপরে তোলে। কয়েকজন মুখোশ পরা লোক তার কাছে আসে এবং তাকে সার্চ করে পিস্তল আর ফ্ল্যাশ ড্রাইভটা নিয়ে নেয়। "ড্রাইভটা চেক করো," গলাটা আবার বলে। একজন ল্যাপটপ খুলে ড্রাইভটা প্লাগ ইন করে। কয়েক মুহূর্ত পর সে বলে, "বুলস আই। এটা লেথে ভাইরাসের মেইন সোর্স কোড আর পেশেন্ট জিরোদের ডেটা।"

স্পটলাইটের আলো একটু কমে আসে। একজন লোক সামনে এগিয়ে আসে। তার মুখটা একটা স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা। "আমি সাইফার," লোকটা বলে। "আমরা জানি আপনার ফ্রেন্ড মিরাকে কোথায় রাখা হয়েছে। তারা তাকে একটা সিক্রেট ব্ল্যাক সাইটে নিয়ে গেছে, যেটা শহরের একদম নিচে, একটা পুরনো বাঙ্কারে। আমরা তাকে উদ্ধার করার একটা প্ল্যান করছি, কিন্তু আমাদের আপনার সাহায্য দরকার।" নাদিরের চোখের সামনে মিরার মুখটা ভেসে ওঠে। "আমি কী করতে পারি?" সে জিজ্ঞেস করে।

সাইফার একটা ম্যাপ খুলে ধরে। "বাঙ্কারের সিকিউরিটি সিস্টেমটা একটা নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কন্ট্রোলড হয়। এটা হ্যাক করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না, কারণ এটা সরাসরি বায়োমেট্রিক্সের সাথে কানেক্টেড। কিন্তু আপনি একজন নিউরোলজিস্ট। আপনি জানেন কীভাবে ব্রেনের সিগন্যাল ম্যানিপুলেট করতে হয়। আমাদের এমন একটা ডিভাইস তৈরি করতে হবে যেটা দিয়ে আমরা বাঙ্কারের সিকিউরিটি সিস্টেমকে বাইপাস করতে পারবো।" নাদির বুঝতে পারে কাজটা কতটা কঠিন। কিন্তু তার কাছে কোনো অপশন নেই। "আমার একটা ল্যাব দরকার," সে বলে।

সাইফার হাসে। "ল্যাব আপনার জন্য রেডি ডক্টর। কিন্তু আমাদের হাতে সময় খুব কম। ওরা মিরার ওপর ইন্টারোগেশন শুরু করে দিয়েছে। ওরা তাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না। আর আপনি জানেন, লেথে ভাইরাস কীভাবে কাজ করে।" নাদিরের বুকটা কেঁপে ওঠে। সে জানে। লেথে ভাইরাস মানুষের ঘুমের সাইকেলের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। যদি মিরাকে বাহাত্তর ঘণ্টা ঘুমাতে না দেওয়া হয়, তাহলে তার ব্রেন পার্মানেন্টলি ড্যামেজ হয়ে যাবে। সে চিরজীবনের জন্য ব্ল্যাংক হয়ে যাবে।

নাদির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। "চলুন কাজ শুরু করি।" সে জানে, এই রাতের শেষ কোথায় সে জানে না। কিন্তু সে এটুকু জানে, মিরাকে ছাড়া সে এই যুদ্ধে লড়তে পারবে না। এবং এই যুদ্ধটা এখন আর শুধু তাদের দুজনের নয়, এই যুদ্ধটা পুরো মানবজাতির মেমোরি বাঁচানোর যুদ্ধ।

#পর্বঃ ৪

ভোর ৫টা ২০ মিনিট। ঢাকার আকাশটা একটা ঘোলাটে ছাই রঙের চাদর মুড়ি দিয়ে আছে। নাদির শ্যাডো প্রোটোকলের আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাবের একটা মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। স্ক্রিনে শহরের বিভিন্ন রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ হ্যাক করে দেখানো হচ্ছে। দৃশ্যগুলো এতটাই পরাবাস্তব যে, নাদিরের মনে হচ্ছে সে কোনো পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক হরর মুভির ভেতরে ঢুকে গেছে। ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত মূল রাস্তাগুলোতে হাজার হাজার মানুষ উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে। তাদের হাঁটার মধ্যে কোনো ছন্দ নেই, কোনো গন্তব্য নেই। তারা একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। গাড়ির হর্ন বাজছে, কিন্তু কেউ রাস্তা থেকে সরছে না। এরা সবাই "ব্ল্যাংক"। লেথে ভাইরাস ঢাকা শহরটাকে গ্রাস করে ফেলেছে।

"ওরা গত চব্বিশ ঘণ্টায় শহরের পানি সরবরাহের সাথে ভাইরাসের একটা মিউটেটেড স্ট্রেইন মিশিয়ে দিয়েছে," সাইফার নিচু গলায় বললো, তার চোখ মনিটরের দিকে স্থির। "এই স্ট্রেইনটা আরও ফাস্ট। ৪৮ ঘণ্টার বদলে ২৪ ঘণ্টায় কাজ করে।" নাদিরের ব্রেন একটা নিউরোলজিক্যাল ইকুয়েশন মেলাতে শুরু করে। পানি! মানুষের শরীরের সত্তর ভাগই পানি। ওয়াটার সাপ্লাইয়ের মাধ্যমে কোনো নিউরোটক্সিন ছড়িয়ে দিলে সেটা ঠেকানোর কোনো উপায় থাকে না। সরকার পুরো ঢাকা শহরটাকে একটা ওপেন এয়ার অ্যাসাইলাম বানিয়ে ফেলেছে।

মনিটরের আরেকটা ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে, কালো ইউনিফর্ম পরা মিলিটারির একটা বিশাল বহর রাস্তা ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে মেগাফোন। কিন্তু তারা ব্ল্যাংকদের উদ্দেশ্যে কোনো ওয়ার্নিং দিচ্ছে না, কারণ তারা জানে এই মানুষগুলোর ব্রেন কোনো ওয়ার্নিং প্রসেস করতে পারবে না। তারা রোবটের মতো এগিয়ে যাচ্ছে এবং ব্ল্যাংকদের ঘিরে ফেলছে। তাদেরকে গবাদি পশুর মতো ট্রাকে তোলা হচ্ছে। "ওদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?" নাদির জিজ্ঞেস করে, তার গলা শুকিয়ে গেছে।

"অপারেশন ক্লিনস্লেট," সাইফার একটা ফোল্ডার টেবিলের ওপর ছুঁড়ে মারে। "শহরের বাইরে কয়েকটা বিশাল ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে। অফিশিয়ালি বলা হচ্ছে এগুলো কোয়ারেন্টাইন জোন। কিন্তু আনঅফিশিয়ালি... এগুলো হলো স্লটারহাউস। যেসব ব্ল্যাংকদের ফিজিক্যাল কন্ডিশন ভালো, তাদের শ্রমিক হিসেবে বিক্রি করা হবে। আর যাদের বয়স বেশি বা যারা দুর্বল, তাদের..." সাইফার বাক্যটা শেষ করে না, কিন্তু নাদির বুঝতে পারে। তাদের মেরে ফেলা হবে। কারণ একটা স্মৃতিহীন, অপ্রয়োজনীয় মাংসপিণ্ডকে সরকার খাওয়াতে রাজি নয়।

#পর্বঃ ৫

নাদিরের পুরনো কর্মস্থল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড থেকে শুরু করে করিডোর, এমনকি হাসপাতালের সামনের রাস্তাতেও রোগীতে ঠাসা। লেথে ভাইরাসের একটা সাইড-ইফেক্ট হলো এক্সট্রিম ইনসোমনিয়া। হিপোক্যাম্পাস ধ্বংস হওয়ার প্রসেসটা শুরু হলে ব্রেন স্লিপ সাইকেল মেনটেইন করতে পারে না। মানুষ দিনের পর দিন জেগে থাকছে। এবং ঘুমের অভাব মানুষের শরীরকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।

নাদির একটা হ্যাক করা সিস্টেমে হাসপাতালের ভেতরের ডেটা দেখছিল। গত রাতে পুরো একটা ওয়ার্ড ফাঁকা হয়ে গেছে। কেউ ঘুমাতে গিয়ে ব্ল্যাংক হয়ে গেছে, আর যারা ভয়ে ঘুমায়নি, তাদের হার্ট ফেইলিওর হয়েছে। ডেডবডি রাখার জায়গা নেই মর্গে। ফিনাইলের গন্ধ আর পচা লাশের গন্ধে হাসপাতালের বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। নাদির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই মৃত্যুগুলো ন্যাচারাল নয়, এগুলো সিস্টেম্যাটিক মার্ডার।

"ল্যাব সেটআপ রেডি ডক্টর," একজন হ্যাকার পেছন থেকে বলে ওঠে। নাদির ঘুরে দাঁড়ায়। তার সামনে একটা টেবিল, যার ওপর কয়েকটা নিউরো-স্টিমুলেটর, কিছু সার্কিট বোর্ড, আর একটা পুরনো ইইজি মেশিন রাখা। তাকে বাঙ্কারের নিউরাল বায়োমেট্রিক সিস্টেম হ্যাক করার জন্য একটা ডিভাইস বানাতে হবে। এমন একটা ডিভাইস, যেটা ব্রেনের ফেক সিগন্যাল জেনারেট করতে পারবে।

"আমাদের হাতে সময় খুব কম," নাদির একটা স্ক্রু-ড্রাইভার হাতে তুলে নেয়। "মিরাকে যেখানে রাখা হয়েছে, সেই বাঙ্কারের লোকেশন পেয়েছো?"

সাইফার মাথা নাড়ে। "পেয়েছি। এটা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পুরনো একটা ফলআউট শেল্টার। মাটির পঞ্চাশ ফুট নিচে। কিন্তু সমস্যা হলো, ওখানে ঢোকার একটাই রাস্তা। আর সেই রাস্তাটা লেভেল ফাইভ সিকিউরিটি দিয়ে মোড়ানো।"

"আমরা কি শুধু মিরাকে আনবো, নাকি পুরো বাঙ্কারের ডেটা সার্ভারটা উড়িয়ে দেবো?" নাদিরের গলায় একটা ঠাণ্ডা, মেটালিক সুর। এই প্রথম নাদির শুধু একজন ডাক্তার নয়, একজন প্রতিশোধকামী মানুষের মতো কথা বলছে।

সাইফার একটু অবাক হয়ে নাদিরের দিকে তাকায়। তারপর তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। "যদি আমরা সার্ভারটা হ্যাক করতে পারি, তাহলে আমরা ভাইরাসের মেইন কন্ট্রোল সিস্টেমটাও ডাউন করে দিতে পারবো। কিন্তু সেটার জন্য আপনাকে সার্ভার রুমে ঢুকতে হবে। আর সেটা একটা সুইসাইড মিশন।"

"মিরা আমার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছে। আমি ওর জন্য পুরো সিস্টেমটা জ্বালিয়ে দিতে পারি," নাদির একটা সার্কিট বোর্ডে সোল্ডারিং আয়রন লাগাতে লাগাতে বলে। তার চোখ দুটো এখন আর ভয় পাচ্ছে না, সেখানে জ্বলছে একটা অদ্ভুত, শীতল আগুন।

বাইরে তখন সকালের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু ঢাকা শহরের আকাশে কোনো সূর্য নেই। সেখানে শুধু ধোঁয়া আর অন্ধকারের রাজত্ব। মানুষগুলো রাস্তায় ঘুরছে, তাদের কোনো স্মৃতি নেই, তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু মাটির নিচে, একটা ছোট স্যাঁতসেঁতে ঘরে, কয়েকজন মানুষ একটা অসম্ভব যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই যুদ্ধটা অস্ত্রের নয়, এই যুদ্ধটা মানুষের মেমোরি, মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ।

#পর্বঃ ৬

রাতের অন্ধকার ঢাকা শহরটাকে একটা বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে। নাদির একটা হ্যাকড সিসিটিভি ফুটেজের দিকে তাকিয়ে আছে। দৃশ্যটা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটা পরিত্যক্ত টেক্সটাইল মিলের। কিন্তু এখন সেটা আর মিল নেই। এর চারপাশে কাঁটাতারের উঁচু বেড়া, প্রতি পঞ্চাশ ফুট অন্তর একটা করে ওয়াচটাওয়ার। ওয়াচটাওয়ারগুলোতে ভারী মেশিনগান ফিট করা। এটা কোনো সাধারণ কোয়ারেন্টাইন জোন হতে পারে না। এটা একটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। মিলিটারির আনমার্কড ট্রাকগুলো একের পর এক ক্যাম্পের ভেতর ঢুকছে। ট্রাকের পেছন থেকে যে মানুষগুলোকে নামানো হচ্ছে, তাদের সবার গায়ে একই রঙের সস্তা অ্যাশ রঙের ইউনিফর্ম। তাদের হাঁটাচলায় কোনো প্রাণ নেই। তারা লেথে ভাইরাসে আক্রান্ত "ব্ল্যাংক" মানুষ।

সাইফার নাদিরের পাশে এসে দাঁড়ায়। তার হাতে একটা কফির মগ, কিন্তু কফিটা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। "আমরা গত চব্বিশ ঘণ্টায় এই ক্যাম্পের ডেটাবেস ইন্টারসেপ্ট করেছি," সাইফার খুব নিচু গলায় বলে। "ওরা এই ব্ল্যাংকদের ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভাগ করছে। যাদের ফিজিক্যাল কন্ডিশন ভালো, তাদের ডান হাতে একটা লাল ব্যান্ড পরানো হচ্ছে। আর যারা দুর্বল, বয়স্ক, বা যাদের কোনো ক্রনিক ডিজিজ আছে, তাদের হাতে পরানো হচ্ছে কালো ব্যান্ড।" নাদির একজন ডাক্তার, সে জানে এই কালার কোডিংয়ের মানে কী। "কালো ব্যান্ড পরা মানুষগুলোকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?" নাদিরের গলাটা অদ্ভূত রকম শান্ত শোনায়, কিন্তু তার ভেতরের রাগটা একটা আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসছে।

সাইফার মনিটরের একটা অংশ জুম করে। ক্যাম্পের পেছনের দিকে একটা বিশাল চুল্লি দেখা যাচ্ছে। চুল্লির চিমনি দিয়ে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। "অপারেশন ক্লিনস্লেট," সাইফার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। "রাষ্ট্রের কাছে এই কালো ব্যান্ড পরা মানুষগুলো হলো ডেড ওয়েট। এদের খাওয়ানোর বা বাঁচিয়ে রাখার কোনো ইকোনমিক জাস্টিফিকেশন সরকারের কাছে নেই। তাই তারা এদের মুছে ফেলছে। চিরতরে। কোনো ডেথ সার্টিফিকেট নেই, কোনো জানাজা নেই। জাস্ট ধোঁয়া হয়ে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে।" নাদির তার চোখ বন্ধ করে ফেলে। সে যে ত্রিশজন রোগীকে প্রথম রাতে দেখেছিল, তাদের মধ্যে কয়েকজন বয়স্ক মানুষও ছিল। তারা হয়তো এতক্ষণে ওই চিমনির কালো ধোঁয়া হয়ে গেছে। এই সিস্টেমটা শুধু মানুষের স্মৃতি মুছছে না, তারা মানুষের অস্তিত্বটাই মুছে দিচ্ছে একটা পারফেক্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে।

#পর্বঃ ৭

শহরের পরিস্থিতি এখন একটা ডিস্টোপিয়ান দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়ংকর। রাত ৮টা বাজার সাথে সাথে পুরো শহরে ব্ল্যাকআউট করে দেওয়া হচ্ছে। স্ট্রিটলাইট থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির আলো, সব বন্ধ। শুধু মিলিটারির আর্মার্ড ভেহিক্যালের সার্চলাইটের আলো শহরের বুক চিরে এদিক-ওদিক ঘুরছে। সরকার একটা নতুন আইন জারি করেছে: 'স্লিপ ম্যান্ডেট'। সবাইকে রাতে ঘুমাতে হবে। কিন্তু মানুষ ঘুমাতে ভয় পাচ্ছে। কারণ লেথে ভাইরাস ঘুমের মধ্যেই তার কাজটা সবচেয়ে পারফেক্টলি করে। যে মানুষটা রাতে তার সন্তানকে বুকে নিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছে, সকালে সে হয়তো সেই সন্তানকেই চিনতে পারবে না। মানুষ তাই কফি, এনার্জি ড্রিংকস, আর ভয়াবহ মাত্রায় স্টেরয়েড নিয়ে জেগে থাকার চেষ্টা করছে।

কিন্তু সরকার এই জেগে থাকাকে ন্যাশনাল সিকিউরিটি থ্রেট হিসেবে ডিক্লেয়ার করেছে। মিলিটারির স্নাইপাররা শহরের উঁচু বিল্ডিংগুলোর ছাদে পজিশন নিয়েছে। রাত ৮টার পর রাস্তায় কাউকে দেখা গেলে, কোনো ওয়ার্নিং শট ফায়ার করা হচ্ছে না। সরাসরি শুট-টু-কিল। নাদির একটা জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরের অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। দূরে একটা গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। তারপর একটা আর্তনাদ, তারপর সব আবার শান্ত। "ওরা জেগে থাকা মানুষগুলোকে ভয় পাচ্ছে," নাদির ফিসফিস করে বলে। "কারণ যারা জেগে আছে, তাদের স্মৃতি এখনো বেঁচে আছে। তারা এখনো প্রশ্ন করতে পারে। তারা এখনো বিদ্রোহ করতে পারে।"

#পর্বঃ ৮

ল্যাবের ভেতর নাদির গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে সেই এনক্রিপ্টেড ফ্ল্যাশ ড্রাইভের ডেটা অ্যানালাইসিস করছে। তার চোখ রক্তজবা হয়ে আছে। সে একটা নিউরো-স্টিমুলেটর সার্কিট বোর্ডের ওপর ঝুঁকে আছে। বাঙ্কারের সিকিউরিটি বাইপাস করার ডিভাইসটা প্রায় রেডি। কিন্তু ডেটাবেস ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে, যেটা তার এত বছরের সায়েন্টিফিক বিলিফ সিস্টেমকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সে সাইফারকে ডাকে। "তুমি এই প্রোটিন সিকোয়েন্সটা দেখো," নাদির একটা থ্রিডি মলিকিউলার মডেল মনিটরে ওপেন করে।

"লেথে ভাইরাস কোনো সাধারণ ভাইরাস না। এটা একটা সিন্থেটিক প্রোটিন ফোল্ডিং এরর। সোজা কথায়, এটা একটা ন্যানো-মেশিনের মতো কাজ করে। এটা মানুষের ব্রেনের হিপোক্যাম্পাসে ঢুকে শুধু নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন বন্ডকে টার্গেট করে। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই ভাইরাসের একটা কিল সুইচ আছে।" নাদির মনিটরের একটা নির্দিষ্ট কোড হাইলাইট করে দেখায়।

সাইফারের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। "কিল সুইচ? তার মানে ওরা চাইলে এই ভাইরাসের ছড়ানো বন্ধ করতে পারে?"

"হ্যাঁ," নাদিরের গলার শিরাগুলো ফুলে ওঠে। "এটা কোনো এক্সিডেন্ট নয়। এটা একটা দেশের বায়োওয়েপন প্রোগ্রামের কোনো লিক নয়। এটা একটা পারফেক্টলি এক্সিকিউটেড প্ল্যান। এবং এই ডেটাবেসের টাইমস্ট্যাম্প দেখো। সরকারের সর্বোচ্চ মহল এই ভাইরাসের অস্তিত্ব সম্পর্কে গত দুই বছর ধরে জানতো। তারা এটা ডেভেলপ করার জন্য ফান্ডিং করেছে। তারা অপেক্ষা করছিল এমন একটা সময়ের জন্য, যখন দেশের ইকোনমি ক্র্যাশ করবে, যখন মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। আর ঠিক সেই সময়েই তারা এই ভাইরাসটা রিলিজ করে দিয়েছে। তারা একটা মেমোরি-লেস স্লেভ ক্লাস তৈরি করতে চায়।"

নাদির টেবিলের ওপর একটা জোরে ঘুষি মারে। "আমাদের শুধু মিরাকে বাঁচালে হবে না। এই কিল সুইচের অ্যাক্সেস কোড ওই বাঙ্কারের মেইন সার্ভারেই আছে। আমাদের ওই সার্ভারটা ধ্বংস করতে হবে।" তার চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই। সেখানে শুধু একটা ঠান্ডা ক্যালকুলেটেড প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। সে জানে, এই মিশনে তাদের ফেরার কোনো গ্যারান্টি নেই। কিন্তু কিছু যুদ্ধ লড়তে হয় শুধু এটা প্রমাণ করার জন্য যে, মানুষ এখনো মেশিন হয়ে যায়নি।

#পর্বঃ ৯

মাটির পঞ্চাশ ফুট নিচে, একটা সাউন্ডপ্রুফ ইন্টারোগেশন রুমে মিরাকে একটা লোহার চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। রুমের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি। সিলিং থেকে ঝোলানো একটা হাই-ইন্টেনসিটি হ্যালোজেন লাইট সরাসরি তার চোখের ওপর ফোকাস করা। তার চোখের পাতাগুলো ফুলে লাল হয়ে আছে। গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় তাকে এক সেকেন্ডের জন্যও ঘুমাতে দেওয়া হয়নি। লেথে ভাইরাস শুধু স্মৃতিই মুছে ফেলে না, এটা মানুষের বেসিক ফিজিওলজিক্যাল নিডগুলোকে ম্যানিপুলেট করে। যখনই মিরার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, তখনই একটা বিকট সাইরেন বেজে উঠছে আর তার চেয়ারের সাথে লাগানো ইলেকট্রোডগুলো দিয়ে একটা মৃদু শক দেওয়া হচ্ছে।

তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই কালো স্যুট পরা অপারেটিভ, যার সাথে নাদিরের হাসপাতালে দেখা হয়েছিল। লোকটার হাতে একটা আইপ্যাড। "মিরা, আপনি একজন ইন্টেলিজেন্ট জার্নালিস্ট। আপনি জানেন আমরা কী চাই," লোকটার গলাটা মেটালিক আর ইমোশনলেস। "ডক্টর নাদির কোথায়? ওই ফ্ল্যাশ ড্রাইভটা কোথায়?" মিরা কোনো কথা বলে না। তার ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। তার ব্রেন এখন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। হ্যালুসিনেশন শুরু হয়ে গেছে। সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে তার মরে যাওয়া মা তাকে ডাকছে। কিন্তু সে জানে এগুলো সব লেথে ভাইরাসের সাইড-ইফেক্ট। সে যদি একবার ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে সে আর মিরা থাকবে না। সে হয়ে যাবে একটা ব্ল্যাংক স্লেট।

"আপনি কি জানেন আপনার ব্রেনের হিপোক্যাম্পাসে এখন কী হচ্ছে?" অপারেটিভটা একটা ঠান্ডা হাসি দেয়। "আপনার মেমোরিগুলো এক এক করে ডিলিট হচ্ছে। প্রথমে যাবে আপনার রিসেন্ট মেমোরি। তারপর আপনার চাইল্ডহুড। আর সবশেষে... আপনার আইডেন্টিটি। ডক্টর নাদিরের নামটা বলুন। নইলে আমি এই লাইটের ইনটেনসিটি আরও বাড়িয়ে দেবো।" মিরা তার সমস্ত উইলপাওয়ার এক করে মাথা তুলে তাকায়। সে তার ফাটা ঠোঁট নেড়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে, "গো টু হেল।" অপারেটিভটা কাঁধ ঝাঁকায়। "আপনার চয়েস।" সে আইপ্যাডে একটা বাটন প্রেস করে। একটা বিকট শব্দে রুমের লাইটটা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আর মিরার শরীরে একটা ইলেকট্রিক শক পাস করে। তার একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ সাউন্ডপ্রুফ রুমের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মিলিয়ে যায়।

#পর্বঃ ১০

এদিকে, মাটির ওপরে, নাদির আর শ্যাডো প্রোটোকলের টিম বাঙ্কারের ভেন্টিলেশন শ্যাফটের কাছে পজিশন নিয়েছে। তাদের সবার গায়ে কালো ট্যাকটিক্যাল গিয়ার। নাদিরের হাতে তার বানানো সেই ডিভাইসটা। সাইফার একটা থ্রিডি ম্যাপ চেক করে ইয়ারপিসে নির্দেশ দিচ্ছে। "ভেন্টিলেশন শ্যাফটের ফ্যানটা জাস্ট তিরিশ সেকেন্ডের জন্য অফ হবে। আমাদের এর মধ্যেই ভেতরে ঢুকতে হবে।" নাদির তার ঘড়ির দিকে তাকায়। ৩... ২... ১... ফ্যানের বিকট শব্দটা হঠাৎ থেমে যায়। টিম লিডার একজন এক্স-মিলিটারি স্নাইপার, সে একটা দড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে যায়। নাদির তার পেছন পেছন নামে।

বাঙ্কারের ভেতরের করিডোরগুলো একটা গোলকধাঁধার মতো। নিয়ন আলোর নিচে তাদের শ্যাডো লম্বা হয়ে পড়ছে। হঠাৎ করে একটা লেজার গ্রিড তাদের পথ আটকে দেয়। "বায়োমেট্রিক স্ক্যানার," সাইফার ফিসফিস করে বলে। "ডক্টর, ইওর টার্ন।" নাদির সামনে এগিয়ে যায়। তার হাত কাঁপছে, কিন্তু তার ব্রেন এখন লেজার ফোকাসড। সে তার ডিভাইসটা স্ক্যানারের প্যানেলে কানেক্ট করে। ডিভাইসটা একটা ফেক নিউরাল সিগন্যাল জেনারেট করতে শুরু করে, যেটা বাঙ্কারের মেইন কমান্ডারের ব্রেনওয়েভ প্যাটার্ন কপি করে তৈরি করা। কয়েক সেকেন্ডের একটা নার্ভব্রেকিং নীরবতা। তারপর গ্রিডটা সবুজ হয়ে খুলে যায়।

তারা সাবধানে ইন্টারোগেশন ব্লকের দিকে এগোতে থাকে। দুটো গার্ডকে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল দিয়ে খুব নীরবে টেকডাউন করা হয়। নাদির ইন্টারোগেশন রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজাটা ভারী ইস্পাতের। সাইফার একটা থার্মাল চার্জ লাগিয়ে দরজাটা উড়িয়ে দেয়। ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে নাদির রুমে ঢোকে। চেয়ারের সাথে বাঁধা মিরার জ্ঞান নেই। তার মাথাটা একপাশে হেলে পড়েছে। নাদির পাগলের মতো ছুটে গিয়ে মিরার পালস চেক করে। পালস খুব দুর্বল, কিন্তু সে বেঁচে আছে। সে দ্রুত বাঁধনগুলো কেটে ফেলে।

"মিরা... মিরা, চোখ খোল," নাদির তার গায়ে একটা অ্যাড্রেনালিন শট পুশ করে। মিরা ধীরে ধীরে চোখ খোলে। তার দৃষ্টি ঘোলাটে। সে নাদিরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব দুর্বল স্বরে বলে, "তুমি... তুমি কে?" নাদিরের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। লেথে ভাইরাস তার কাজ শুরু করে দিয়েছে। মিরার আংশিক মেমোরি ইরেজ হয়ে গেছে। সে নাদিরকে চিনতে পারছে না। নাদিরের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। সে মিরার হাতটা শক্ত করে ধরে বলে, "আমি নাদির। আমরা একসাথেই বের হবো এখান থেকে। আমি তোমাকে সব মনে করিয়ে দেবো।" এই ডিস্টোপিয়ান নরকে, এই অন্ধকার রুমে, এটাই তাদের একমাত্র মুহূর্ত। একটা ভাঙা, অসম্পূর্ণ মুহূর্ত। কিন্তু তাদের হাতে সময় নেই। সাইফার চিৎকার করে ওঠে, "ডক্টর, এলার্ম বেজে গেছে! আমাদের এখনই বের হতে হবে!"

#পর্বঃ ১১

টিমটা যখন বাঙ্কার থেকে বের হওয়ার জন্য লড়াই করছে, নাদির মেইন সার্ভার রুমে ঢুকে পড়ে। তার টার্গেট ছিল কিল সুইচ। কিন্তু সার্ভার হ্যাক করতে গিয়ে সে এমন একটা ফাইল পায়, যেটা পুরো গেমের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ফাইলটার নাম 'ড. ভেরা'। ড. ভেরা ছিলেন এই প্রজেক্ট লেথের মেইন সাইন্টিস্ট। সরকার তাকে একটা সিক্রেট লোকেশনে বন্দী করে রেখেছে এবং জোর করে অ্যান্টিডোট বানাতে বাধ্য করছে। কিন্তু সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, ড. ভেরা ইচ্ছে করেই সরকারকে ভুল ফর্মুলা দিচ্ছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তার সৃষ্টি একটা মনস্টারে পরিণত হয়েছে।

নাদির দ্রুত ফাইলটা তার ড্রাইভে কপি করে নেয়। "সাইফার, আমাদের প্ল্যান চেঞ্জ করতে হবে," নাদির ইয়ারপিসে বলে। "কিল সুইচটা কাজ করবে না। ওরা ওটা এনক্রিপ্ট করে ফেলেছে। আমাদের ড. ভেরাকে দরকার। তিনিই একমাত্র মানুষ যিনি সত্যিকারের অ্যান্টিডোট বানাতে পারবেন।" সাইফারের গলাটা একটু চিন্তিত শোনায়। "কিন্তু ড. ভেরা কোথায় আছেন, সেটা কি ফাইলে আছে?" নাদির একটা বাঁকা হাসি দেয়। "আছে। কিন্তু জায়গাটা পৃথিবীর সবচেয়ে সিকিউরড জায়গাগুলোর একটা। তারা তাকে একটা সাবমেরিনে আটকে রেখেছে, যেটা বঙ্গোপসাগরের নিচে ঘুরছে।"

গেমটা এখন আর শুধু ঢাকা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা এখন একটা গ্লোবাল ওয়ার। এবং এই যুদ্ধে জেতার একমাত্র চাবিকাঠি এখন ড. ভেরার হাতে। নাদির আর তার টিম মিরাকে নিয়ে বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে, কিন্তু সেই আলোতে কোনো আশা নেই। আছে শুধু একটা দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পূর্বাভাস।

#পর্বঃ ১২

জেনেভার জাতিসংঘের সদর দপ্তর। বাইরে বরফ পড়ছে, কিন্তু ভেতরের পরিবেশ আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত। একটা হাই-সিকিউরিটি, সাউন্ডপ্রুফ কনফারেন্স রুমে বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশের প্রতিনিধিরা বসে আছেন। তাদের সামনের বড় স্ক্রিনে লেথে ভাইরাসে আক্রান্ত শহরগুলোর ফুটেজ চলছে। ঢাকা, রিও ডি জেনিরো, লাগোস, কায়রো, সব শহরের চিত্র একই। হাজার হাজার ব্ল্যাংক মানুষ রাস্তায় ঘুরছে, আর মিলিটারি তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই কনফারেন্স রুমে কোনো প্যানিক নেই। আছে শুধু একটা ঠান্ডা, ইকোনমিক ক্যালকুলেশন।

মার্কিন প্রতিনিধি, একজন তীক্ষ্ণ চোখের মহিলা, তার মাইক্রোফোনটা অন করলেন। "জেন্টলমেন, আমাদের ইমোশনাল হওয়ার সময় নেই। লেথে ভাইরাস একটা রিয়েলিটি। কিন্তু এই রিয়েলিটি আমাদের জন্য একটা আনপ্রেসিডেন্টেড ইকোনমিক অপরচুনিটিও ক্রিয়েট করেছে।" তিনি একটা স্লাইড চেঞ্জ করলেন। স্ক্রিনে এখন আফ্রিকার আর এশিয়ার কিছু আক্রান্ত দেশের ম্যাপ, যেখানে প্রচুর ন্যাচারাল রিসোর্স আছে। "এই দেশগুলোর সরকার এখন তাদের জনগণকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। তারা আমাদের কাছে সাহায্য চাইছে। আমরা তাদের হিউম্যানিটারিয়ান এইড দেবো। কিন্তু তার বদলে, আমরা তাদের রিসোর্সগুলোর এক্সক্লুসিভ রাইটস নেবো। এটা একটা ট্রিলিয়ন ডলারের গেম।"

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন প্রতিনিধি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেন। "কিন্তু এটা তো একটা জেনোসাইড! আমরা কীভাবে এটা সাপোর্ট করতে পারি?" রাশিয়ান প্রতিনিধি একটা শুষ্ক হাসি দিলেন। "ডক্টর, পলিটিক্সে কোনো জেনোসাইড নেই, আছে শুধু কোল্যাটারাল ড্যামেজ। আমরা যদি এখন এই দেশগুলোতে ইন্টারফেয়ার করি, তাহলে এই ভাইরাস আমাদের দেশেও আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং, ওই দেশগুলো তাদের অপ্রয়োজনীয় জনসংখ্যা কমিয়ে ফেলুক। আমরা শুধু প্রফিটটা নেবো।"

এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সব জানে। তারা জানে এই ভাইরাসটা একটা বায়োওয়েপন, তারা জানে এটা কীভাবে কাজ করে। কিন্তু তারা চুপ করে আছে। কারণ এই ব্ল্যাংক মানুষগুলোর কোনো ভোটিং রাইটস নেই, তাদের কোনো ইকোনমিক ভ্যালু নেই। ধনতান্ত্রিক এই পৃথিবীতে, যার ইকোনমিক ভ্যালু নেই, তার বেঁচে থাকারও কোনো অধিকার নেই।

#পর্বঃ ১৩

শ্যাডো প্রোটোকলের আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাবে এখন একটা দমবন্ধ করা পরিবেশ। মিরা একটা পুরনো সোফায় শুয়ে আছে। তার চোখে শূন্যতা। সে বারবার নাদিরকে জিজ্ঞেস করছে, "আমি এখানে কেন? তুমি কে?" প্রতিবার এই প্রশ্নটা নাদিরের বুকের ভেতর একটা ধারালো ছুরি চালিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তার এখন ভেঙে পড়ার সময় নেই। ল্যাবের অন্য পাশে, টিমের ভেতরে একটা ভয়ংকর ফাটল তৈরি হয়েছে।

"আমরা এই গেমটা জিততে পারবো না ডক্টর!" টিমের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, রাফি, চিৎকার করে ওঠে। তার চোখ দুটো লাল, গত তিনদিন ধরে সে ঘুমায়নি। "সরকারের কাছে মিলিটারি আছে, টেকনোলজি আছে। আর আমাদের কাছে কী আছে? একটা ভাঙা নিউরোলজিস্ট আর একটা হাফ-ব্ল্যাংক জার্নালিস্ট? আমি বলছি, আসুন আমরা সরকারের সাথে একটা ডিল করি। আমরা ড. ভেরার লোকেশনটা তাদের দিয়ে দিই, বিনিময়ে তারা আমাদের অ্যান্টিডোট দেবে।"

সাইফার রাফির কলার চেপে ধরে। "তুমি বিশ্বাসঘাতকতার কথা বলছো? তুমি জানো এই সরকার কী করছে?"

রাফি সাইফারকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। "আমি শুধু বাঁচতে চাই! আমি ব্ল্যাংক হতে চাই না!" হঠাৎ করে রাফির কথা আটকে যায়। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে যায়। তার হাত থেকে বন্দুকটা খসে পড়ে। সে ফ্যালফ্যাল করে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে। লেথে ভাইরাস তার কাজ করে দিয়েছে। ঘুমের অভাবে রাফির ব্রেন শাটডাউন হয়ে গেছে। সে এখন একজন ব্ল্যাংক।

পুরো ল্যাবে একটা পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। নাদির ধীরে ধীরে রাফির কাছে যায়। সে রাফির চোখের দিকে তাকায়, সেখানে কোনো আত্মা নেই, কোনো ভয় নেই। "আমাদের ওকে এখানেই রেখে যেতে হবে," নাদির একটা শক্ত গলায় বলে। সাইফার প্রতিবাদ করতে যায়, "কিন্তু ও আমাদের টিমের মেম্বার!"

"ও আর আমাদের টিমের মেম্বার নেই। ও এখন একটা ডেড ওয়েট," নাদিরের গলাটা অদ্ভুতরকম ঠান্ডা। এই যুদ্ধটা নাদিরকে ভেতর থেকে পাল্টে দিচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, সিস্টেমকে হারাতে হলে তাকেও সিস্টেমের মতোই নির্মম হতে হবে।

#পর্বঃ ১৪

ঢাকা শহরের আকাশে হঠাৎ করে কয়েক ডজন মিলিটারি ড্রোন উড়তে শুরু করে। ড্রোনগুলো থেকে মেগাফোনে একটা অ্যানাউন্সমেন্ট ব্রডকাস্ট করা হচ্ছে। শহরের বড় বড় ডিজিটাল বিলবোর্ডগুলোতে একটা প্রোপাগান্ডা ভিডিও চলছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কিছু হাসিমুখের মানুষ, যারা একটা সুন্দর, পরিষ্কার শহরে কাজ করছে। তাদের কোনো চিন্তা নেই, কোনো কষ্ট নেই।

অ্যানাউন্সমেন্টটা হচ্ছে: "প্রিয় নাগরিকবৃন্দ, সরকার আপনাদের সুরক্ষার জন্য একটা নতুন প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে—'প্রজেক্ট রিবার্থ'। লেথে ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচার একটাই উপায়, নিয়ন্ত্রিত ঘুম। আগামীকাল রাত ১২টায় পুরো শহরের পানি সরবরাহ আর বাতাসে একটা স্লিপ-ইন্ডিং গ্যাস রিলিজ করা হবে। আপনারা সবাই ঘুমিয়ে পড়বেন। এবং যখন জাগবেন, তখন আপনাদের আর কোনো কষ্ট থাকবে না, কোনো হতাশা থাকবে না। আপনারা হবেন নতুন রাষ্ট্রের নতুন নাগরিক।"

নাদির ল্যাবের মনিটরে এই অ্যানাউন্সমেন্টটা শুনছিল। তার হাত শক্ত হয়ে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়। "এটা আর মহামারী নেই," সে ফিসফিস করে বলে। "এটা একটা পারফেক্ট ক্যু। ওরা পুরো দেশের মানুষকে রিসেট করতে চাইছে। ওরা চায় আমরা সবাই ভুলে যাই আমাদের অতীত, আমাদের কালচার, আমাদের আইডেন্টিটি। ওরা চায় আমরা একটা ব্রেনলেস ওয়ার্কফোর্সে পরিণত হই, যারা শুধু নির্দেশ মানবে।"

সাইফার নাদিরের পাশে এসে দাঁড়ায়। "আমাদের হাতে মাত্র ছাব্বিশ ঘণ্টা সময় আছে ডক্টর। কাল রাত ১২টার আগে আমাদের সার্ভার হ্যাক করে ওই গ্যাস রিলিজ করা আটকাতে হবে। এবং তার জন্য আমাদের ড. ভেরাকে দরকার।"

নাদির মিরার দিকে তাকায়। মিরা তখনো দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে। নাদির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। "তাহলে চলো, আমরা বঙ্গোপসাগরের নিচে যাই। একটা সাবমেরিন হাইজ্যাক করা খুব কঠিন কাজ হবে না, তাই না?" তার গলায় একটা ডার্ক, সিনিক্যাল হিউমার। কিন্তু এই ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীতে, এই হিউমারটাই তাদের একমাত্র বেঁচে থাকার রসদ।

#পর্বঃ ১৫

বঙ্গোপসাগরের গভীর অন্ধকার জলের নিচে, একটা ব্ল্যাক-অপস মিলিটারি সাবমেরিন নিঃশব্দে ভাসছে। এটা কোনো সাধারণ সাবমেরিন নয়, এটা একটা ভাসমান ব্ল্যাক সাইট। শ্যাডো প্রোটোকলের টিম একটা কমার্শিয়াল ডাইভিং বেল মডিফাই করে সাবমেরিনটার এয়ারলকের সাথে অ্যাটাচ করেছে। নাদির আর সাইফার ভেতরে ঢোকে। সাবমেরিনের ভেতরটা একটা হাসপাতালের মতো সাদা আর মেটালিক। তারা সাইলেন্সার দিয়ে কয়েকজন গার্ডকে খুব দ্রুত টেকডাউন করে।

ড. ভেরাকে রাখা হয়েছে একটা স্পেশাল আইসোলেশন সেলে। সেলটা যখন খোলা হলো, নাদির চমকে ওঠে। ড. ভেরা একজন সত্তর বছরের বৃদ্ধ, কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার বয়স একশ পার হয়ে গেছে। তার চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে, চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। তিনি একটা হুইলচেয়ারে বসে আছেন। নাদিরকে দেখে তিনি একটা শুকনো হাসি দেন। "আমি জানতাম কেউ না কেউ আসবে," তার গলাটা ফিসফিসানির মতো। "কিন্তু তোমরা অনেক দেরি করে ফেলেছো।"

"আমাদের অ্যান্টিডোট ফর্মুলাটা দরকার, ডক্টর," নাদির খুব অস্থিরভাবে বলে।

ড. ভেরা মাথা নাড়েন। "অ্যান্টিডোট বলে কিছু নেই, ইয়াং ম্যান। আমি লেথে ভাইরাস বানিয়েছিলাম একটা আলঝেইমার্স কিওর হিসেবে। কিন্তু ওরা... ওরা এটাকে একটা অস্ত্রে পরিণত করেছে। ওরা যখন আমার ফান্ডিং বন্ধ করে দিতে চাইলো, আমি ওদের এই ভাইরাসের ডেটা দিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম আমি বিজ্ঞানকে বাঁচাচ্ছি। কিন্তু আমি আসলে একটা দানব তৈরি করেছি।" ড. ভেরার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। একজন বিজ্ঞানীর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, যখন তার সৃষ্টি মানবতার ধ্বংসের কারণ হয়।

"কিন্তু আপনি তো ওদের একটা ভুল ফর্মুলা দিচ্ছিলেন!" সাইফার বলে ওঠে।

"হ্যাঁ," ড. ভেরা একটা গভীর শ্বাস নেন। "আমি ওদের সময় নষ্ট করছিলাম। কিন্তু একটা উপায় আছে। লেথে ভাইরাস একটা স্পেসিফিক ফ্রিকোয়েন্সিতে ব্রেনের নিউরনগুলোকে ডিসকানেক্ট করে। আমরা যদি মেইন সার্ভার থেকে একটা রিভার্স ফ্রিকোয়েন্সির অডিও পালস পুরো শহরের ব্রডকাস্ট সিস্টেমে পাঠাতে পারি, তাহলে যারা এখনো পুরোপুরি ব্ল্যাংক হয়নি, তাদের নিউরাল পাথওয়েগুলো আবার কানেক্টেড হবে।" তিনি তার হুইলচেয়ারের কুশনের নিচ থেকে একটা ছোট, রক্তমাখা চিপ বের করে নাদিরের হাতে দেন। "এটা সেই রিভার্স ফ্রিকোয়েন্সি কোড। এটা দিয়ে তুমি রিসেট অপারেশন থামাতে পারবে। কিন্তু মনে রেখো, যারা অলরেডি ব্ল্যাংক হয়ে গেছে... তারা আর কখনো ফিরবে না।"

#পর্বঃ ১৬

ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং ব্রডকাস্ট টাওয়ারের মেইন কন্ট্রোল রুম। রাত ১১টা বেজে ৪০ মিনিট। আর মাত্র বিশ মিনিট পর পুরো শহরে স্লিপ-ইন্ডিং গ্যাস রিলিজ করা হবে। নাদির, সাইফার এবং শ্যাডো প্রোটোকলের বাকি টিম কন্ট্রোল রুমের দিকে এগোচ্ছে। এটা একটা সুইসাইড মিশন। পুরো এলাকা মিলিটারির স্নাইপার আর আর্মার্ড ভেহিক্যাল দিয়ে ঘেরা।

অপারেশনটা শুরু হয় একটা বিশাল বিস্ফোরণ দিয়ে। শ্যাডো প্রোটোকলের একজন মেম্বার একটা ট্রাক ভর্তি বিস্ফোরক নিয়ে মেইন গেটে ক্র্যাশ করে। চারদিকে আগুন আর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এই ডিস্ট্রাকশনের সুযোগে নাদির আর সাইফার সার্ভার রুমের দিকে দৌড়ে যায়। কিন্তু মিলিটারির এলিট ফোর্স তাদের ঘিরে ফেলে। শুরু হয় একটা ভয়ংকর গানফাইট। সার্ভার রুমের চারপাশের কাঁচগুলো গুলির আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

"ডক্টর, যাও! আমরা ওদের আটকে রাখছি!" সাইফার চিৎকার করে ওঠে। তার পায়ে একটা গুলি লেগেছে, সে ফ্লোরে পড়ে গিয়েও ফায়ার করছে। নাদির জানে, সে যদি এখন সাইফারকে বাঁচাতে যায়, তাহলে পুরো শহর ধ্বংস হয়ে যাবে। সে একটা শেষবারের মতো লুক দেয় সাইফারের দিকে, তারপর সার্ভার রুমের ভারী দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দেয়।

#পর্বঃ ১৭

সার্ভার রুমের ভেতরটা নিয়ন আলোয় আলোকিত। বিশাল বিশাল ডেটা র‍্যাকগুলো একটা দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নাদির দ্রুত মেইন কনসোলে ছুটে যায়। সে ড. ভেরার চিপটা প্লাগ ইন করে কোড রান করতে শুরু করে। স্ক্রিনে দেখাচ্ছে: "রিভার্স ফ্রিকোয়েন্সি আপলোডিং... ২০%"।

ঠিক তখনই সার্ভার রুমের পেছনের একটা সিক্রেট দরজা খুলে যায়। সেই কালো স্যুট পরা অপারেটিভটা ভেতরে ঢোকে। তার হাতে একটা পিস্তল। "গেম ওভার, ডক্টর," সে ঠান্ডা গলায় বলে। নাদির ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই লোকটা ফায়ার করে। বুলেটটা নাদিরের কাঁধে লাগে। সে ছিটকে ফ্লোরে পড়ে যায়।

অপারেটিভটা কনসোলের দিকে এগিয়ে আসে কোডটা ক্যানসেল করার জন্য। কিন্তু নাদির তার শেষ শক্তি দিয়ে লোকটার পা ধরে টেনে ফেলে দেয়। শুরু হয় একটা ফিজিক্যাল ফাইট। নাদির একজন ডাক্তার, সে মারামারি জানে না। কিন্তু তার ভেতরে এখন একটা পশুর মতো আক্রোশ কাজ করছে। সে লোকটার চোখে বুড়ো আঙুল ঢুকিয়ে দেয়, তারপর তাকে ধাক্কা দিয়ে একটা ইলেকট্রিক প্যানেলের ওপর ফেলে দেয়। একটা বিকট স্পার্ক হয়, লোকটা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

নাদির খুব কষ্টে কনসোলের দিকে আবার এগোয়। "আপলোডিং... ৯৮%"। হঠাৎ সে অনুভব করে তার ঘাড়ের পেছনে একটা তীব্র ব্যথা। কেউ একজন তাকে একটা ইনজেকশন পুশ করেছে। সে ঘুরে দেখে, আরেকজন মিলিটারির লোক দাঁড়িয়ে আছে। ইনজেকশনটা ছিল লেথে ভাইরাসের একটা কনসেন্ট্রেটেড ডোজ। নাদিরের চোখের সামনে সবকিছু ঘোলাটে হতে শুরু করে। তার ব্রেনের কানেকশনগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছে। সে কনসোলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তার শেষ শক্তি দিয়ে সে 'ENTER' বাটনটা প্রেস করে।

#পর্বঃ ১৮

রাত ১২টা। পুরো ঢাকা শহরে একটা অদ্ভুত অডিও পালস বেজে ওঠে। সাইরেন, রেডিও, টিভির স্পিকার, সবকিছু থেকে একটা হাই-পিচ সাউন্ড বের হয়। এই সাউন্ডটা মানুষের ব্রেনের হিপোক্যাম্পাসে একটা ইলেকট্রিক্যাল শক দেয়। রিসেট অপারেশন ফেইল করেছে। গ্যাস রিলিজ হয়নি। যারা আংশিক ব্ল্যাংক হয়েছিল, তাদের জ্ঞান ফিরতে শুরু করে।

মিরা শ্যাডো প্রোটোকলের ল্যাবে বসে ছিল। হঠাৎ এই সাউন্ডটা শোনার পর তার ব্রেনে একটা জট খুলে যায়। তার স্মৃতিগুলো একটা ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ফিরে আসতে থাকে। সে তার নাম মনে করতে পারে, সে নাদিরকে মনে করতে পারে। সে বুঝতে পারে নাদির তার জন্য কী করেছে।

কিন্তু নাদির? নাদির তখন সার্ভার রুমের ফ্লোরে পড়ে আছে। মিরা যখন ব্যাকআপ টিম নিয়ে সার্ভার রুমে পৌঁছায়, তখন নাদির চোখ খোলা রেখে ফ্যালফ্যাল করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মিরা ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। "নাদির... নাদির, আমি মিরা। আমাকে চিনতে পারছো?"

নাদির খুব ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায়। তার চোখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা। সে একটা দুর্বল হাসি দিয়ে বলে, "মিরা... নামটা খুব সুন্দর। কিন্তু... তুমি কে?" মিরার পৃথিবীটা সেখানেই ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে, তারা যুদ্ধটা জিতেছে, কিন্তু সে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।

#পর্বঃ ১৯

সকাল হয়েছে। লেথে ভাইরাসের প্রজেক্ট লিক হওয়ার পর পুরো পৃথিবীতে একটা ঝড় ওঠে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া সত্যটা জেনে যায়। কিন্তু এই ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীতে জাস্টিস বলে কিছু নেই। সরকারের শীর্ষ নেতারা, যারা এই জেনোসাইডের মাস্টারমাইন্ড ছিল, তারা খুব সহজেই প্রাইভেট জেটে করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম নিয়ে নেয়। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো ফুলেফেঁপে ওঠে।

ড. ভেরা সাবমেরিনের ভেতরেই নিজেকে একটা লেথাল ইনজেকশন দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি একটা সুইসাইড নোটে লিখে যান: "বিজ্ঞান কখনো ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে মানুষের লোভ। আমি আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করলাম।"

কোনো ট্রাইব্যুনাল হয় না। কোনো ফাঁসি হয় না। শুধু কিছু মিড লেভেলের মিলিটারি অফিসারকে বলির পাঁঠা বানানো হয়। পৃথিবী আবার তার নিজের নিয়মে ঘুরতে শুরু করে, যেন কিছুই হয়নি।

#পর্বঃ ২০

ছয় মাস পর।

ঢাকার আকাশ আজ খুব পরিষ্কার। শহরটা আবার স্বাভাবিক ছন্দে চলতে শুরু করেছে। মানুষ কাজে যাচ্ছে, ক্যাফেগুলো ভিড়ে ঠাসা। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার নিচে একটা বিশাল ক্ষত লুকিয়ে আছে। লাখ লাখ মানুষ, যারা পুরোপুরি ব্ল্যাংক হয়ে গিয়েছিল, তারা আর কখনো ফিরে আসেনি। তাদের রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে রাখা হয়েছে। তারা এখন একটা জীবন্ত লাশের সমাজ।

নাদির তার অ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনিতে বসে আছে। তার কোলে একটা পুরনো ডায়েরি। মিরা তার পাশে বসে একটা কফির মগ হাতে নিয়ে তাকে দেখছে। নাদির ডায়েরিতে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করছে। তার মেমোরি পুরোপুরি যায়নি, কিন্তু সেটা একটা ভাঙা আয়নার মতো হয়ে গেছে। কিছু টুকরো আছে, কিছু নেই। মিরা তাকে প্রতিদিন তার অতীতের গল্প শোনায়। সে তাকে শেখায় সে কে ছিল।

নাদির ডায়েরি থেকে মুখ তুলে মিরার দিকে তাকায়। "আমি কি আসলেই একজন ভালো ডাক্তার ছিলাম?"

মিরা একটা ম্লান হাসি দেয়। তার চোখে পানি চিকচিক করছে। "তুমি ছিলে এই শহরের সেরা ডাক্তার। তুমি আমাদের সবাইকে বাঁচিয়েছো।"

নাদির আবার ডায়েরির দিকে তাকায়। সে কলমটা শক্ত করে ধরে শেষ লাইনটা লেখে।

"আমরা জিতেছি। কিন্তু আমরা আর আগের মানুষ নই।"

I'd love to hear from you. Email me at: nasifwrites@gmail.com